সোহেল মিয়া,দোয়ারাবাজার(সুনামগঞ্জ):
নদীর বালি কুড়ে পাথর তুলছিলো আমির,জুসেন ও তার ভাতিজা মেহেদী হাসান সৌরভ,ভাগিনা নাজমুল ইসলাম রাতুল। ঘরের কাজের জন্য পাথর তুলছেন তারা। ওদের কাছেই জানা গেল ওখানেই পাথর তুলে তারা টাকা রুজি করে।
তবে সেদিন পাথর বিক্রি না করে নিজেদের ঘর বানানোর জন্য বাড়িতে নিচ্ছে পাথর।
শিশুরা জানালো,সেদিন ছিলো বুধবার তাদের স্কুল সচরাচর বন্ধ হয় না। শুধু শুক্র ও শনিবার বন্ধ থাকে। আর যেদিন স্কুল বন্ধ থাকে, সেদিন তারা পাথর তুলতে ব্যস্থ থাকে।
কথা হচ্ছিল সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার নরসিংপুর ইউনিয়নের চেলানদীর পারের কয়েকটি শিশুর সঙ্গে।
ওরাও স্বপ্ন দেখে বড় হবার,বিদেশ ( প্রবাস) গিয়ে স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন তাদের।
তারা পূর্বচাইরগাঁও গ্রামের একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুলে পড়াশুনা করে। অন্য এলাকার শিক্ষার্থীদের জিঞ্জেস করা হলে তাদের কেউ পুলিশ অফিসার, কেউ ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার কথা বলে। তবে ওই তিন শিশুদের স্বপ্ন তারা বড় হয়ে বিদেশ ( প্রবাস)যাবে।
নার্সারি শ্রেনিতে পড়ে মেহেদী হাসান সৌরভ। তার বাবা বিদেশে (আরব আমিরাত) থাকেন। তার সাথে থাকা দুই চাচা ক্লাস তৃতীয় শ্রেনী পর্যন্ত স্কুলে গিয়েছে।
প্রথম শ্রেনীতে পড়ে নাজমুল ইসলাম রাতুল। তার বাবা ওই নদীতে পাথর তুলার কাজ করেন।
তারা জানান তাদের সাথে যারা পড়াশোনা করে, তাদের সবাই কমবেশি স্কুল ছুটি কাটিয়ে পাথর তুলে ব্যস্থ দিন কাটায়।
শিশু সৌরভ জানালো, সে ইংরেজি ছড়া বলতে পারে। শোনাল ‘টুইংকেল টুইংকেল লিটল স্টার’ ছড়া । তারপর শিশুদের মধ্যে শুরু হলো কার আগে কে কী শোনাবে তার প্রতিযোগিতা।
এখানে চায়ের দোকানের মানিক মিয়া জানান, সপ্তাহে ৫ দিন পাঠদান হয় স্কুলে। ওই গ্রামে কোন সরকারি স্কুল থাকায় ছিন্নমূল এই অধিকাংশ শিশুদের শিক্ষা সেবাদেন স্কুলার্স নামের একটি বেসরকারি কিন্ডারগার্টেন। তিনি জানান, নদীর পারের এই শিশুদের অক্ষর জ্ঞান দেওয়ার পাশাপাশি সদাচরণ শিক্ষা দেওয়াই ওই কিন্ডারগার্টেন’র উদ্দেশ্য। এই উদ্দেশ্যে তারা আশপাশের কয়েকটি গ্রামের শিশুদের পড়ান। সেখানে শিশুদের পড়াশোনার জন্য তাদের খোলা আকাশের নিচে বসতে হয় না।
স্কুলের প্রধান শিক্ষক সামির আলী জানান, ২০১৮ সাল থেকে তারা এই স্কুল পরিচালনা করছেন। ২ শতাধিক দরিদ্র ছেলেমেয়ে পড়াশুনা করছেন। স্কুলের সচ্ছল শিক্ষার্থী ও পরিচালনা কমিটির সদস্যদের অর্থায়নে এই স্কুল পরিচালিত হয়।
কীভাবে এই স্কুল করার কথা ভাবলেন প্রশ্ন করলে স্কুল পরিচালনা কমিটির সভাপতি মকবুল হোসেন বলেন, ‘চেলার পারের শিশুদের দেখে মনে হবে আমাদের দেশের অনেক পরিবার আজও ছেলে মেয়েদের সঠিক শিক্ষা দিতে পারছেনা,ওই গ্রামে নেই সরকারি কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।প্রতিষ্ঠানের অভাব,দায়িত্বশীলতার অভাব,কেউর আবার অর্থের অভাব। অনেকের ভাত খেতেই কষ্ট হয়। কীভাবে তাদের ছেলেমেয়েদের পড়াশুনা করাবে। আর সদাচরণ শিক্ষা দেওয়াতো অনেক দূরের কথা।
কিন্তু এর অভাবেই ছোট্ট শিশুরা দিনে দিনে বড় হয়ে নানাবিধ অপকর্মে জড়িয়ে পড়ে। কিন্তু যদি তাদের ভালোমন্দ শিক্ষা দেওয়া যায় তবে পরিস্থিতি কিছুটা হলেও বদলাবে, এই চিন্তা থেকেই স্কলার্স একাডেমির পথ চলা শুরু।’ তাদের মধ্যে কি কোনো পরিবর্তন দেখছেন প্রশ্ন করলে বলেন, শুরুর দিকে ওদেরকে প্রশ্ন করলে ওরা বলত বড় হয়ে পাথরের কাজ করবে,ইন্ডিয়ায় পাথর ব্যবসায়ীদের এজেন্ট হয়ে চাকরি করবে। ওরা আসলে বড় হওয়ার জগৎটাই অনুভব করতে পারত না। আর এখন প্রশ্ন করলে বলে পুলিশ অফিসার হবে, ডাক্তার হবে,ইন্জিনিয়ার হবে। কেউ কেউ বিদেশে লেখা পড়া করবে।