মোহাঃ ফরহাদ হোসেন কয়রা(খুলনা)প্রতিনিধি :
দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ পানিতে লবণের পরিমাণ দিন দিন বাড়ছে। গভীর নলকূপের পানিতে পাওয়া যাচ্ছে সহনীয় মাত্রার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি লবণের উপস্থিতি ও আয়রন । মূলত জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রের পানির স্তর ভূগর্ভস্থ পানির স্তরের সংস্পর্শে আসায় এ সংকট সৃষ্টি হয়েছে। পানিতে লবণাক্ততার পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় শুষ্ক মৌসুমে সুপেয় পানির সংকটে পড়ে উপকূলবর্তী জেলাগুলোর বাসিন্দারা। বিশেষ করে স্কুলগুলোতে থাকা গভীর নলকূপের পানি পানের অযোগ্য হওয়ায় বিপাকে পড়ে শিশুরা। ক্লাস চলাকালীন দীর্ঘ সময় পানি পান না করে বা সামান্য পানি পান করে কাটাতে হয় তাদের। যার ফলে শরীরে পানিশূন্যতার সৃষ্টি হয়ে স্বাস্থ্যঝুঁকির আশঙ্কা দেখা দেয়।
খুলনার কয়রা উপজেলার অধিকাংশ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নলকূপের পানি পানের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। কারণ পানিতে অতিমাত্রায় লবন ও আয়রন ।
উপজেলা শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা যায়, কয়রায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ১৪২টি । এসব বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২২ হাজার। বিদ্যালয়গুলোর নলকূপে আর্সেনিকের মাত্রা বিপদসীমার ওপরে। কোনোটিতে গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে বেশি আয়রন। যে কারণে এসব নলকূপের পানি পান করা যায় না। শুধু বিদ্যালয় নয় উপজেলার সর্বত্রই সুপেয় পানির সংকট।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশের বেশির ভাগ অঞ্চলের পানিতে লবণের সহনীয় মাত্রা প্রতি লিটারে ১৫০ থেকে ৬০০ মিলিগ্রাম। আর উপকূলে এ মাত্রা প্রতি লিটারে এক হাজার মিলিগ্রাম। কিন্তু কয়রা উপজেলার অধিকাংশ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্থাপিত নলকূপের পানিতে ক্লোরাইড, আর্সেনিক ও আয়রনের মাত্রা অনেক বেশি। ২৮টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নলকূপের পানির নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষায় তিনটির পানিতে লিটারে এক হাজার মিলিগ্রামের কিছু কম লবণ, তিনটির নমুনায় দুই হাজারের কম, ১০টিতে তিন হাজারের কম, সাতটিতে তিন বেশি—বাকিগুলোতে প্রতি লিটারে চার-পাঁচ হাজার মিলিগ্রাম লবণ পাওয়া গেছে।
উপজেলার আমাদি ইউনিয়নের দক্ষিণ চান্নির চক শিশুমেলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শুষ্ক মৌসুমে সুপেয় পানির ব্যবস্থা নেই। স্কুলের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ৩০০ লিটার ধারণক্ষমতার একটি ট্যাঙ্কে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করা হয়। তাতে বর্ষাকাল শেষে পরবর্তী এক মাসের জন্য পানির জোগান রাখা যায়। বাকি সময় পুকুরের পানি ফিটকিরি দিয়ে পানের ব্যাবস্থা করা হয়।
এই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জোছিমোন্নেছা জানান, তার প্রতিষ্ঠানে ১৯৩ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। ক্লাস চলাকালে প্রায় আধা কিলোমিটার দূরে পুকুর থেকে ১০ টাকার বিনিময়ে দুই কলস পানি এনে তা ফিটকিরি দিয়ে বিশুদ্ধ করে শিশুদের খাওয়ানো হয়। কিন্তু এতোগুলো শিক্ষার্থীর জন্য দুই কলস পানি খুবই অপ্রতুল।
ভাগবা বনফুল বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শহিদুল ইসলাম বলেন, আমার বিদ্যালয়ে পানির ব্যবস্থা নেই। গড়িয়াবাড়ি বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক সুকুমার থান্দার বলেন, অনেক শিক্ষার্থী বাড়ি থেকে পানি নিয়ে আসে।
উপজেলা শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা যায় স্থানীয় কিছু স্কুল নিজেদের উদ্যোগে স্বপ্ন ধারণক্ষমতার ট্যাঙ্কে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করছে। তবে শুষ্ক মৌসুমে এই পানি দিয়ে চাহিদা পূরণ হয় না। জানতে চাইলে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর কয়রার উপ- সহকারী প্রকৌশলী ইসতিয়াক আহমেদ বলেন, দুই বছরে লজিক প্রকল্পসহ বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে ১৫ থেকে ২০টি বিদ্যালয়ের ছাদে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য ট্যাঙ্ক স্থাপন করা হয়েছে। তা থেকে কিছুটা হলেও উপকৃত হচ্ছে শিশুরা। উপজেলা শিক্ষা অফিসার হাবিবুর রহমান বলেন, অনেক বিদ্যালয়ে সুপেয় পানির ব্যবস্থা করা হয়েছে। আর যে সব স্কুলে পানির ব্যবস্থা নেই সে সব বিদ্যালয়ে প্রকল্পের মাধ্যমে পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণের চেষ্টা চলছে। এ ছাড়া কিছু এলাকায় শিক্ষার্থীরা স্কুলে অবস্থানের সময় পানি পায় না। তাই কেউ কেউ বাড়ি থেকে বোতলে করে পানি নিয়ে আসে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে যানানো হয়েছে