মোঃনাসির উদ্দিন গাজীপুর জেলা প্রতিনিধি
গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার সনমানিয়া ইউনিয়নের আড়াল মধ্যপাড়া হানির দোকান এলাকায় জাহেদুল ইসলাম (২৮) নামের এক যুবককে শুক্রবার রাতে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে হত্যা করেছে এলাকার চিহ্নিত চাঁদাবাজ সন্ত্রাসী বাহিনী ।
নিহত জাহেদুল ইসলাম সনমানিয়া বড়কান্দা গ্রামের হারিস মিয়ার ছেলে। তাঁর বাবা হারিছ মিয়া কাপাসিয়া উপজেলা নির্বাচন অফিসের কর্মচারী ছিলেন। জাহিদুলের মা রোকেয়া বেগম সনমানিয়া ইউনিয়ন পরিষদের ৭,৮ ও ৯ নং ওয়ার্ডের সংরক্ষিত মহিলা মেম্বার। বড় ভাই আলমগীর হোসেন গাজীপুর বারের আইনজীবী।
গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যার দিকে সন্ত্রাসীরা জাহিদুলকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে যায়।
আড়াল মধ্যপাড়ার হানির দোকান মোড়ে সড়কের পাশে একটি পাট ক্ষেতে ফেলে সন্ত্রাসীরা তাঁকে উপর্যুপরি কুপাতে থাকে। পাট ক্ষেত থেকে দৌড়ে রাস্তায় উঠলে সন্ত্রাসীরা আবারো তাঁর উপর ধারালো অস্ত্র নিয়ে ঝাপিয়ে পড়ে।
মুমূর্ষু অবস্থায় তাঁকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার পথে জাহিদুল মারা যায়।
নিহত জাহেদুল ইসলামের ৫ বছরের একটি কন্যা সন্তান রয়েছে। এ জঘন্য ঘটনায় বাড়িতে চলছে স্ত্রী, শিশু সন্তান, মা ও স্বজনদের আহাজারি। পরিবারের সবাই যেনো বাকরুদ্ধ। গ্রামে চলছে শোকাবহ পরিবেশ।
এলাকার লোকজন যানায়, শুক্রবার সন্ধ্যার পর কয়েকজন যুবক মোবাইল ফোনে ডেকে নিয়ে যায় জাহেদুলকে। পরে রাতে ১০ টার দিকে আড়াল হানির দোকান মোড় এলাকায় জাহিদুলের নিথর রক্তাক্ত দেহ দেখতে পায় স্থানীয়রা। এবং পরে পুলিশে খবর দেয়। নিহতের শরীরের বিভিন্ন স্থানে ধারালো অস্ত্রের অসংখ্য আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। হাত, পীঠ সহ পায়ের রগ কেটে ফেলা হয়েছে।
নিহতের স্ত্রী রোনাজারি করে স্থানীয় সাংবাদিকদের বলেন, এলাকার মঈনুল, মুন্না, মজিবুর প্রায় সময়ই জাহিদুলকে ডেকে নিয়ে যেতো। মঈনুল গত রমজানে তাকে ছুরি দিয়ে মেরে ফেলার চেষ্টা করেছিলো বলে তার স্ত্রী অভিযোগ করেন।
এ ঘটনার সনমানিয়া গ্রামের গাফফার নামে এক যবককে আটক করেছে থানাপুলিশ। সে জাহিদুল হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত ছিল বলে জানাযায়।
পরিবারের অভিযোগ, জাহিদুলের বাড়ির পাশে হামিদা ও নুরুন্নাহার নামে দুই মহিলা প্রতিবেশী বাড়ি নির্মাণ করতে গেলে এলাকার মইনুল, মারুফ, সৈকত, মুন্না, মজিবুর সহ কয়েকজন চাঁদাবাজ সন্ত্রাসী মোটা অংকের চাঁদা দাবি করে। প্রথমে তাদের কিছু চাঁদা দেয়া হয়। পরে আবার তারা মোটা অংকের চাঁদা দাবি করেন।
এ বিষয়টি স্থানীয় পর্যায়ের নেতৃবৃন্দের কাছেও অভিযোগ করা হয়েছিলো বলে পরিবারের লোকজন জানায়।
নিহত জাহিদুলের ভাগিনা সনমানিয়া গ্রামের হুমায়ুন বলেন, এলাকার ওসব লোকের চাঁদাবাজির কর্মকাণ্ডে বাধা দেওয়ায় জাহেদুলের ওপর ক্ষুব্ধ ছিল প্রভাবশালী সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজ চক্রটি । এ ঘটনার জের হিসেবে অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে জাহিদুলকে রাতে কৌশলে ডেকে নিয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়।
নিহতের বড় ভাই গাজীপুর বারের বিশিষ্ট আইনজীবী আলমগীর হোসেন বলেন, “জাহিদুল এলাকায়, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও যাবতীয় অন্যায় কাজের প্রতিবাদ করত। এজন্যই তাকে পরিকল্পিতভাবে ঠান্ডা মাথায় মেরে ফেলা হয়েছে।”
এক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, রাতে কয়েকজনকে ওই পাটক্ষেতের আশেপাশে সন্দেহজনকভাবে ঘোরাফেরা করতে দেখা গিয়েছিলো।
কাপাসিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জয়নাল আবেদিন বলেন, ” ঘটনার পরপরই আমরা তদন্ত শুরু করেছি। নিহতের মোবাইল কললিস্ট সংগ্রহ করা হয়েছে, সন্দেহভাজন কয়েকজনকে নজরদারিতে রাখা হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তৎপরতার মাধ্যমে হত্যাকারীদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে।
হত্যার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ওই এলাকায় ৫/৬ জনের একটি গ্রুপ রয়েছে। তাদের মধ্যে সম্ভবত টাকা পয়সার ভাগবাটোয়ারা নিয়ে বিরোধ ছিলো। নিজেদের মধ্যে অন্তকোন্দলের জের হিসেবে এ হত্যাকান্ড সংঘটিত হয়েছে বলে তিনি ধারণা পোষণ করেন”।
নিহতের মামাতো ভাই সাখাওয়াত হোসেন সাকির জানান, মুমূর্ষু অবস্থায় জাহিদুলকে প্রথমে কাপাসিয়া হাসপাতাল থেকে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। এ সময় তাঁর মা ও বড় ভাই উপস্থিত ছিলেন।
থানা পুলিশের কাছে জাহিদুল তাঁকে কারা কারা কুপিয়েছে তাদের নামও বলে যান। পরে আশংকাজনক অবস্থায় দ্রুত গাজীপুরে তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ও সেখান থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার পথে আনুমানিক রাত সাড়ে তিনটার দিকে সে মারা যায়।
আজ শনিবার সন্ধ্যায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে ময়নাতদন্ত শেষে জাহিদুলের লাশ কাপাসিয়া থানায় নিয়ে আসে তাঁর আত্মীয় স্বজন। তাঁর লাশ থানায় রেখেই মামলার প্রস্তুতি চলছে।
জাহিদুলের বড়ভাই অ্যাডভোকেট আলমগীর হোসেন জানান,তিনি নিজেই মামলার বাদী হচ্ছেন। মৃত্যুর আগে জাহিদুলের বলে যাওয়া সন্ত্রাসীদের নামেই মামলা হবে। অযথা কাউকে হয়রানি করা হবেনা। তিনি মামলায় ৬ জনকে আসামী করা হচ্ছে বলে জানান। এবং অজ্ঞাত আছে ৫/৭ জন আসামি।
মামলার মূল আসমাীরা হলেন,সনমানিয়া গ্রামের নুরুল হুদার পুত্র মঈনুল (২৮), আড়াল গ্রামের হিরণের ছেলে মারুফ (২৬),আড়াল মিয়া পাড়ার বেলাল হোসেনের পুত্র সৈকত( ২২),সনমানিয়া গ্রামের জসীমউদ্দিনের পুত্র গাফফার, মজিবুর, পিতা অজ্ঞাত, সনমানিয়া গ্রামের মনির হোসেন এর পুত্র মুন্না (২৮) আসামি বলে বড় ভাই জানান।
এদিকে এ হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে এলাকায় চরম আতঙ্ক ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, “জাহেদুল ভালো মানুষ ছিলেন, অন্যায়ের প্রতিবাদ করতেন, তাই তাকে হত্যা করা খুবই দুঃখজনক। আমরা দ্রুত বিচার চাই।”আরেকজন বলেন, “এ ধরনের ঘটনা আমাদের এলাকায় আগে হয়নি, আমরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি।” ওদের সাথে জাহিদুলের চলাফেরা ছিলো। এ গ্রুপটি মাদকের সাথেও জড়িত ছিল বলে কেউ কেউ জানান।
শেষ খবর পর্যন্ত নিহতের লাশ কাপাসিয়া থানা থেকে গ্রামের বাড়িতে নেয়া হয়েছে। আজ রাতেই জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তারা লাশ দাফন করা হবে।