মো: জনি হাসান, গাজীপুর
গাজীপুর, অক্টোবর ২, ২০২৫— গাজীপুরের কালিয়াকৈরে তুরাগ নদে প্রতিমা বিসর্জনের এক আনন্দময় মুহূর্তে ঘটে গেল এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। বৃহস্পতিবার (২ অক্টোবর) বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে উপজেলার চাপাইর ব্রিজের পশ্চিম পাশে ইঞ্জিনচালিত নৌকাডুবিতে দুই শিশু নিখোঁজ হয়েছে। নিখোঁজ হওয়া শিশুরা হলো: হিজলতলী এলাকার স্বপনের মেয়ে অঙ্কিতা (২.৫) এবং একই এলাকার তাপশের ছেলে তন্ময় মনি দাশ (৭)। এ ঘটনা পুরো এলাকায় শোকের ছায়া ফেলেছে। দুর্ঘটনার পর থেকেই নদীর পাড়ে ভিড় করছেন শত শত উৎকণ্ঠিত মানুষ।
শারদীয় দুর্গাপূজার সমাপ্তি উপলক্ষে প্রতিমা বিসর্জন ছিল তুরাগ নদের পাড়ে। স্থানীয় হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা প্রতি বছর এই সময়টিতে বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনার সঙ্গে দেবীকে বিদায় জানান। অন্যান্য দিনের মতোই বৃহস্পতিবার বিকেলে কালিয়াকৈরের চাপাইর ব্রিজ সংলগ্ন এলাকায় ছিল উৎসবের আমেজ। নিখোঁজ শিশু অঙ্কিতা ও তন্ময়ও পরিবারের সঙ্গে গিয়েছিল প্রতিমা বিসর্জন দেখতে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, উৎসবের মুহূর্তটি আরও কাছ থেকে উপভোগ করার জন্য শিশু দুটি তাদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ছোট্ট একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকায় চড়েছিল। নৌকাটি যখন চাপাইর ব্রিজের কাছাকাছি পৌঁছায়, তখনই ঘটে বিপত্তি। নদীর বুকে এগিয়ে আসা আরেকটি বড় ইঞ্জিনচালিত নৌকার সঙ্গে ছোট ডিঙি নৌকাটির সজোরে সংঘর্ষ হয়। এই অপ্রত্যাশিত আঘাতে মুহূর্তেই ছোট নৌকাটি উল্টে গিয়ে তুরাগ নদের অথৈ জলে ডুবে যায়।
নৌকায় থাকা নারী, পুরুষ ও অন্য কয়েকজন যাত্রী দ্রুত নিজেদের সামলে নিয়ে সাঁতরে পাড়ে উঠতে সক্ষম হন। কিন্তু এই বিশৃঙ্খলার মধ্যে দুই শিশু অঙ্কিতা ও তন্ময় মনি দাশকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। নদীর তীব্র স্রোত এবং দ্রুত ডুবে যাওয়ার ঘটনায় তাদের উদ্ধারে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। পাড়ে ওঠা মানুষজন দ্রুতই দুই শিশুর নিখোঁজ হওয়ার খবরটি ছড়িয়ে দেন, যা মুহূর্তেই উৎসবের আমেজকে বিষাদে রূপ দেয়।
দুর্ঘটনার পরপরই ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকা স্থানীয় জনতা কোনো বিলম্ব না করে নদীতে নেমে পড়েন। তারা নিজেদের জীবন বিপন্ন করে নিখোঁজ শিশুদের খোঁজে তল্লাশি শুরু করেন। কিন্তু নদীর জল ও স্রোত বেশি থাকায় এবং ডুবে যাওয়া স্থানটি চিহ্নিত করতে সমস্যা হওয়ায় স্থানীয়দের উদ্ধার প্রচেষ্টা ফলপ্রসূ হয়নি। তাদের আন্তরিক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও শিশু দুটির কোনো খোঁজ মেলেনি।
এদিকে, খবর পেয়ে দ্রুতই ঘটনাস্থলে পৌঁছায় কালিয়াকৈর ফায়ার সার্ভিসের একটি দল। তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে দ্রুত উদ্ধার কার্যক্রম শুরু করার প্রস্তুতি নেন। তবে, এ ধরনের গভীর জলের উদ্ধারকাজের জন্য অত্যাবশ্যকীয় বিশেষজ্ঞ ডুবুরি দল তাৎক্ষণিকভাবে কালিয়াকৈর ফায়ার সার্ভিসের কাছে উপস্থিত ছিল না।
কালিয়াকৈর ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন অফিসার ইফতেখার হোসেন রায়হান চৌধুরী এ বিষয়ে সংবাদমাধ্যমকে নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, নৌকাডুবির ঘটনায় দুই শিশু নিখোঁজ রয়েছে এবং তাদের উদ্ধারের জন্য বিশেষায়িত ডুবুরি দলের প্রয়োজন। জরুরি ভিত্তিতে ডুবুরি দলের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, “আমরা ঘটনাস্থলে এসেছি এবং স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে দুর্ঘটনার বিস্তারিত জানার চেষ্টা করছি। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এই মুহূর্তে আমাদের কাছে ডুবুরি দল না থাকায় আজ (বৃহস্পতিবার) রাতে উদ্ধার অভিযান শুরু করা সম্ভব হচ্ছে না। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, আগামীকাল (শুক্রবার) সকালে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল এসে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করবে।” রাতভর নদীর স্রোত ও নিরাপত্তা জনিত কারণে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।
নিখোঁজ শিশুদের পরিবারে এখন চলছে শোকের মাতম। ২.৫ বছর বয়সী অঙ্কিতা এবং ৭ বছর বয়সী তন্ময়ের বাবা-মা ও আত্মীয়-স্বজনের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে তুরাগ নদের পাড়। তারা বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন এবং নদীর দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রয়েছেন। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তাদের শান্তনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন।
এদিকে, স্থানীয়দের মধ্যে এই ঘটনা নিয়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তারা বলছেন, প্রতিমা বিসর্জনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ও জনবহুল অনুষ্ঠানে তুরাগ নদে নৌ-চলাচলে কেন কোনো নিয়ন্ত্রণ বা পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা রাখা হয়নি। উৎসবের সময় নৌকার সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও, নৌ-চলাচলের নিয়ম-কানুন না মানার কারণেই এই ধরনের দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে তাদের অভিযোগ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, “ছোট নৌকা এবং বড় নৌকার সংঘর্ষ হওয়া খুবই দুর্ভাগ্যজনক। উৎসবের সময় নৌকার ভিড় থাকে, তখন আরও সতর্ক থাকা উচিত ছিল। এছাড়া, এত বড় একটি ইভেন্টে ফায়ার সার্ভিসের কাছে কেন তাৎক্ষণিক ডুবুরি দল থাকবে না—এই প্রশ্নও উঠেছে।”
এই মর্মান্তিক নৌকাডুবির ঘটনাটি আবারও নদীবহুল বাংলাদেশের জলপথের নিরাপত্তার দুর্বলতা ফুটিয়ে তুলল। দুর্গাপূজা বা অন্য কোনো উৎসবের সময় যখন নদীতে অতিরিক্ত ভিড় হয়, তখন বিশেষ করে ছোট এবং অরক্ষিত নৌকায় অতিরিক্ত যাত্রী বহন করা বা নিয়ম না মেনে বেপরোয়াভাবে নৌকা চালানোর ঘটনা ঘটে। স্থানীয় প্রশাসন এবং নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই এই ধরনের অনুষ্ঠানগুলোতে জলপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আরও কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। লাইফ জ্যাকেটের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা এবং উৎসবের সময় দ্রুত উদ্ধার তৎপরতার জন্য ডুবুরি দলসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখা জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞ মহল।
গভীর রাতেও শত শত মানুষ নদীর তীরে অপেক্ষা করছেন। সকলের চোখ এখন ভোরের আলোর দিকে, যখন ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল এসে নিখোঁজ দুই শিশুর উদ্ধারের কাজ শুরু করবে। পুরো কালিয়াকৈর এখন অঙ্কিতা ও তন্ময়ের জন্য প্রার্থনায় রত।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শুক্রবার সকাল থেকে বিশেষ ডুবুরি দল তাদের অভিযান শুরু করবে। স্থানীয় প্রশাসন নিখোঁজ শিশুদের পরিবারের পাশে থাকার এবং সার্বিক সহযোগিতা করার আশ্বাস দিয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে স্থানীয় প্রশাসন ও ফায়ার সার্ভিসের পরবর্তী পদক্ষেপগুলো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে এবং তাদের উদ্ধার অভিযানের ফলাফলের ওপর নির্ভর করবে পরিবার এবং এলাকার মানুষের মানসিক অবস্থা।