মোঃ নাসির উদ্দিন, গাজীপুর জেলা প্রতিনিধি
গাজীপুরের কালীগঞ্জে টঙ্গী-ঘোড়াশাল বাইপাস সড়কের দেওপাড়া চত্বর এলাকা আজ (শুক্রবার) সকালে এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনার সাক্ষী হলো। বিপরীত দিক থেকে আসা একটি বেপরোয়া ড্রাম ট্রাকের চাপায় সিএনজি চালিত অটোরিকশার দুই যাত্রী ঘটনাস্থলেই নিহত হয়েছেন। এই হৃদয়বিদারক ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও তিনজন, যাদের মধ্যে গুরুতর অবস্থায় দুজনকে উচ্চতর চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
আজ সকাল আনুমানিক ৯টার দিকে এই দুর্ঘটনাটি ঘটে। নরসিংদীগামী একটি সিএনজি অটোরিকশা দেওপাড়া চত্বর এলাকায় পৌঁছালে, বিপরীত দিক থেকে আসা দ্রুতগতির একটি ড্রাম ট্রাক সেটিকে সজোরে ধাক্কা দেয়। স্থানীয়রা জানান, ধাক্কার তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে অটোরিকশাটি দুমড়ে-মুচড়ে যায় এবং এর যাত্রীরা ছিটকে পড়েন। ঘটনাস্থলেই দুজন যাত্রী গুরুতর আঘাতের কারণে প্রাণ হারান।
দুর্ঘটনার পরপরই স্থানীয়রা ছুটে এসে উদ্ধার কাজে হাত লাগান এবং পুলিশকে খবর দেন। স্থানীয়দের তৎপরতায় গুরুতর আহত তিনজনকে দ্রুত অটোরিকশা থেকে উদ্ধার করা হয়।
পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে নিহতদের পরিচয় পুরোপুরি নিশ্চিত করতে পারেনি। তবে, নিহত দুজনের মধ্যে একজনের পরিচয় জানা গেছে। তিনি হলেন ময়মনসিংহ জেলার তারাকান্দা এলাকার আবু তালেব, যিনি শুক্কুর মাহমুদের ছেলে।
আহতদের মধ্যে রয়েছেন সিরাজগঞ্জ জেলার হাফিজুর (৪০), তার স্ত্রী ছালমা বেগম (৩৫) এবং তাদের চার বছর বয়সী ছেলে তামিম। পরিবারটি সফিপুর থেকে সিএনজি অটোরিকশায় করে কালীগঞ্জ হয়ে নরসিংদী যাচ্ছিলেন। তাদের পারিবারিক ভ্রমণের সমাপ্তি ঘটলো এক ভয়াবহ দুর্ঘটনার মধ্য দিয়ে।
আহতদের দ্রুত উদ্ধার করে কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক জানান, আহতদের অবস্থা গুরুতর। প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদানের পর, তাদের উন্নত চিকিৎসার জন্য গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করা হয়েছে। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, আহতদের মধ্যে হাফিজুর এবং তার শিশুপুত্র তামিমের অবস্থা আশঙ্কাজনক। চিকিৎসকরা তাদের জীবন বাঁচাতে সবরকম চেষ্টা করছেন।
দুর্ঘটনার পর পরই ঘাতক ট্রাকের চালক দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়। পুলিশ দুর্ঘটনাস্থল থেকে ট্রাক এবং দুমড়ে যাওয়া অটোরিকশাটি উদ্ধার করেছে এবং ট্রাক চালককে আটকের জন্য অভিযান শুরু করেছে।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত কালীগঞ্জ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মাকসুদুল কবির নকিব দুর্ঘটনার বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, “দুর্ঘটনায় দুজন মারা গেছেন। আমরা দ্রুততার সাথে একজনের পরিচয় শনাক্ত করতে পেরেছি, অন্যজনের পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা চলছে। আহত তিনজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য গাজীপুর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। আমরা মামলা গ্রহণ করে তদন্ত শুরু করেছি এবং পালিয়ে যাওয়া চালক ও ট্রাকটি আটকের জন্য বিভিন্ন পয়েন্টে তল্লাশি চালাচ্ছি।”
এসআই নকিব আরও জানান, নিহতের মৃতদেহ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়েছে।
দুর্ঘটনাটি আবারও টঙ্গী-ঘোড়াশাল বাইপাস সড়কের দেওপাড়া চত্বরের নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, এই স্থানটি এর আগেও একাধিক মারাত্মক দুর্ঘটনার সাক্ষী হয়েছে।
স্থানীয়রা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দ্রুতগতির ট্রাক ও অন্যান্য ভারি যানবাহনের বেপরোয়া চলাচল এবং সড়কের নকশা ত্রুটির কারণে প্রায়শই এখানে দুর্ঘটনা ঘটে। তারা জানান, এই চত্বরে কোনো নির্দিষ্ট ট্র্যাফিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা না থাকায় এবং বাইপাস সড়কে যানবাহনের গতি অত্যধিক হওয়ায় এমন দুর্ঘটনা নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
উল্লেখযোগ্যভাবে, এর মাত্র কয়েক মাস আগে ২০২৪ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর রাত ১১টার দিকে একই স্থানে দাঁড়িয়ে থাকা একটি কাভার্ডভ্যানে সিএনজি চালিত অটোরিকশা ধাক্কা মারলে মর্মান্তিকভাবে পাঁচজন যাত্রী নিহত হয়েছিলেন। স্থানীয়রা মনে করছেন, কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে সড়কের নিরাপত্তা নিশ্চিতে স্থায়ী কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলেই এই ধরনের মর্মান্তিক পুনরাবৃত্তি ঘটছে।
স্থানীয় প্রশাসনের প্রতি সড়ক নিরাপত্তা বাড়ানো, ট্র্যাফিক আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করা এবং দ্রুতগতির ভারি যানবাহনের চলাচল নিয়ন্ত্রণে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা। এই বারবার ঘটা দুর্ঘটনাগুলো স্পষ্টতই এই গুরুত্বপূর্ণ বাইপাস সড়কের নিরাপত্তা ত্রুটিগুলো তুলে ধরেছে, যা এখন দ্রুত সমাধানের দাবি রাখে।
কালীগঞ্জের এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনাটি বাংলাদেশের সড়ক নিরাপত্তার নাজুক চিত্রকে আবারও সামনে আনলো। একটি পরিবার সফিপুর থেকে নরসিংদী যাওয়ার পথে এভাবে দুর্ঘটনার শিকার হলো, যা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে যাত্রাপথে সাধারণ মানুষ কতটা ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। স্থানীয়দের উদ্বেগ এবং একই স্থানে বারবার প্রাণহানির ঘটনা প্রমাণ করে যে কেবল আইন প্রয়োগ নয়, সড়ক ব্যবস্থাপনা এবং প্রকৌশলগত ত্রুটিগুলো দূরীকরণের জন্য সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। ট্র্যাফিক নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা জোরদার করা এবং ঘন ঘন দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকাগুলোতে গতি নিয়ন্ত্রণের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।