সোমবার, ০৯ মার্চ ২০২৬, ০৪:০৩ অপরাহ্ন
শিরোনাম
শিরোনাম
এআই অটো জুম ফিচারে এবার ঈদুল ফিতরের গ্রুপ সেলফি তোলা আরও সহজ মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে শ্রীপুরে সাংবাদিকদের মানববন্ধন আমিরাতে বিরূপ পরিস্থিতির মধ্যেও প্রয়োজনীয় খাদ্য আমদানি অব্যাহত রেখেছে খুচরা বিক্রেতারা শ্রীপুরে ভুল চিকিৎসায় প্রসূতির মৃত্যু: হাসপাতাল সিলগালা করার নির্দেশ, পলাতক কর্তৃপক্ষ শ্রীপুরে ভুল চিকিৎসায় প্রসূতির মৃত্যুর অভিযোগ, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের পলায়ন সুবর্ণচরে চলাচলের পথে বাঁধার প্রতিবাদে মানববন্ধন  গাজীপুরে অবৈধভাবে মাটি কাটার দায়ে ৬ জনকে কারাদ-ড্রামট্রাকও জব্দ কবি মাহমুদুল হাসান নিজামীর মৃত্যুতে সাফল্য সাহিত্য সংস্কৃতি পরিবারের শোক  শ্রীপুর পৌর বিএনপির সদস্য সচিব বিল্লাল হোসেন বেপারীর পক্ষ থেকে মাওনা চৌরাস্তা ছিন্নমূলদের মাঝে ইফতার বিতরণ ভেড়ামারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এমপি আব্দুল গফুরের মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত

কৃষি উন্নয়ন ও বীজ বিপ্লবের পথিকৃৎ: সাইমন নেন্নে গ্রুট

নজমুল হক, স্টাফ রিপোর্টার গাজীপুর / ১৪৮ টাইম ভিউ
আপডেট : শনিবার, সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৫, ২:৪৬ অপরাহ্ণ

নজমুল হক স্টাফ রিপোর্টার গাজীপুর 

বিশ্বে খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষির টেকসই উন্নয়নে কৃষির মূল ভিত্তি হিসেবে বীজের ভূমিকা সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। মানসম্পন্ন বীজ একজন বীজচাষীর জীবনযাত্রার মান পাল্টে দিতে পারে, এমনকি একটি দেশের অর্থনীতিকেও নতুন গতিপথে চালিত করতে পারে। গত পাঁচ দশকে সারা বিশ্বজুড়ে কৃষির উন্নয়নে যে অভাবনীয় বিপ্লব ঘটেছে তার নেপথ্যে রয়েছে মানসম্পন্ন বীজ উৎপাদন এবং বাজারজাতকরণ ব্যবস্থার ব্যাপক অগ্রগতি তথা বীজশিল্পের ঊর্ধ্বমুখী বিকাশ। বিশ্বজুড়ে বীজশিল্প বিশেষ করে সবজী বীজ শিল্পের বিকাশে সর্বাগ্রে যাঁর নামটি উঠে আসে তিনি হলেন কৃষিতে সবুজ বিপ্লবের জনক নোবেল লরিয়েট ড. নরম্যান বোরলগের সূযোগ্য উত্তরসূরী, কৃষি ও বীজ বিজ্ঞানের এক অনন্য স্বপ্নদ্রষ্টা, ডাচ উদ্ভাবক ও উদ্যোক্তা কৃষিতত্ত্ববিদ সাইমন নেম্নে গ্রুট (১৯৩৪-২০২৫)। গ্রুট বীজশিল্প বিকাশের এমন একজন আলোকিত পথিকৃতের নাম যে তাঁর বর্ণাট্য কর্মজীবনের পুরোটাই বিনিয়োগ করেছেন উন্নয়নশীল দেশের ক্ষুদ্র বীজচাষীদের উন্নত সবজি বীজ ও জ্ঞান সরবরাহের মাধ্যমে এক নিরব কৃষিবিপ্লবের সাফল্যজনক বাস্তবায়নে। তিনি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে শুরু করে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত কৃষির রূপান্তরে বলিষ্ট ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য উচ্চমানের বিশেষ করে স্থানীয় পরিবেশে অভিযোজিত হাইব্রিড সবজি বীজ উদ্ভাবন করে কৃষিক্ষেত্রে নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেন। তাঁরঅবদান শুধু বীজ উৎপাদনে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং ক্ষুদ্র কৃষকের ক্ষমতায়ন, বাজারে প্রবেশাধিকার, প্রশিক্ষণ ও জ্ঞান বিতরণ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। তাঁর এসব ভূমিকা মূল্যায়ন করে ২০১৯ সালে তাঁকে “কৃষির নোবেল” খ্যাত ওয়ার্ল্ড ফুড প্রাইজ প্রদান করা হয়, যা বিশ্বব্যাপী বীজশিল্পের বিকাশে তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেব গণ্য করা হয়। এবছরেরই জুলাই মাসের ১ম সপ্তাহেই আন্তর্জাতিক বীজবিজ্ঞানের এই পথিকৃতকে আমরা হারিয়েছি, তাই লেখার সূচনাতেই তাঁর বিদেহী আত্মার প্রতি অপরিসীম শ্রদ্ধা ও পরিবার-পরিজন, বন্ধুবান্ধব এবং সহকর্মীদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি।

গ্রুটের মতো খুব কম ব্যক্তিই বিশ্বব্যাপী কৃষিক্ষেত্রের ভূদৃশ্যকে এমন গভীরভাবে পুনর্গঠন করতে পেরেছেন। কৃষির উন্নয়নে সত্যিকারের একজন স্বপ্নদ্রষ্টা গ্রুট বিশ্বের ৮০ টিরও বেশি দেশে লক্ষ লক্ষ ক্ষুদ্র কৃষককে ক্ষমতায়িত করেছেন উন্নত সবজী বীজ ও প্রযুক্তিকে তাঁদের দোড়গোড়ায় পৌঁছে দেয়ার মাধ্যমে। বিশ্বব্যাপী টেকসই কৃষি তথা খাদ্য নিরাপত্তায় তাঁর অগ্রণী ভূমিকা, সুবিধাবঞ্চিত ক্ষুদ্রচাষীদের উন্নত সবজি বীজ এবং ব্যবহারিক জ্ঞান বিতরনের মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ মানুষকে দারিদ্র্য থেকে বের করে আনার মতো মহান ব্রতকে স্বীকৃতি দিয়েছেন বিশ্ব খাদ্য পুরস্কারের আয়োজকরা। তাইতো, সম্প্রতি এই মনিষীর তিরোধানের পর তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ওয়ার্ল্ড ফুড প্রাইজ ফাউন্ডেশনের সভাপতি মাশাল হোসেন সংগঠনটির ওয়েবপেজে লিখেন-“সাইমন গ্রুট ছিলেন একজন শান্ত দৃঢ় সংকল্প এবং গভীর দূরদৃষ্টিসম্পন্ন মানুষ। আমি কখনই তাঁর পুরষ্কার পাওয়ার বছরটি ভুলব না-বিশেষ করে তাঁর কৃষকদরদী বড় মনের কথা, যে কিনা বক্তৃতায় নিজের সম্পর্কে না বলে কৃষক এবং বীজ সম্পর্কে যেভাবে কথা বলেছিলেন। তিনি মনেপ্রানে বিশ্বাস করতেন “বীজের মতো এতো ছোট জিনিসও লক্ষ লক্ষ মানুষের জন্য একটি উন্নত ভবিষ্যৎ উন্মোচন করে দিতে পারে।” তাঁর বর্ণাট্য জীবনের প্রতি আলোকপাত করে, ‘বিশ্ব খাদ্য পুরস্কার’ বিজয়ী নির্বাচন কমিটির সভাপতি এবং ২০০৯ সালের বিশ্ব খাদ্য পুরস্কার বিজয়ী গেবিসা এজেতা বলেন, “সাইমন এক মহান শক্তি এবং চেতনার নাম যিনি বিশ্বব্যাপী দারিদ্রপীড়িত জনগোষ্ঠীকে দারিদ্র্য থেকে বের করতে ও পুষ্টি ঝুঁকিতে থাকা সম্প্রদায়ের পুষ্টিযোগান বাড়াতে বেসরকারী খাতের ভূমিকা প্রদর্শনে একটি ইতিবাচক শক্তি ছিলেন।”কৃষি ও কৃষকদরদী এই মহানুভব মানুষটি বাংলাদেশসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দারিদ্র্যপীড়িত ক্ষুদ্র কৃষকদের মুখোমুখি হওয়া চ্যালেঞ্জসমুহ একেবারে কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করেন। তাঁদের অনগ্রসর গতানুগতিক চাষ পদ্ধতি, নিজস্বভাবে উৎপাদিত ও সংরক্ষিত নিম্নমানের বীজ ব্যবহার এবং এর পরিনামে ফসলের নিম্ন উৎপাদনশীলতা তাঁকে ব্যাথিত করে। এই উপলব্দি থেকেই এসমস্ত ক্ষুদ্র সবজীচাষীদেরকে প্রধান ক্লায়েন্ট বেস হিসাবে নিয়ে প্রথম বাজার-ভিত্তিক সবজি বীজ প্রজনন সংস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তাঁর ঐতিহাসিক যাত্রা শুরু হয়। তিনি ১৯৮২ সালে ফিলিপাইনে ইস্ট-ওয়েস্ট সিড প্রতিষ্ঠা করেন এই ধারণা নিয়ে যে একটি ভালো বীজ দরিদ্র বীজচাষীদের জীবনযাত্রাকে সম্পূর্ণভাবে বদলে দিতে পারে। বছরের পর বছর ধরে এ নিয়ে নিরন্তর গবেষণা এবং উন্নয়নের পর, গ্রুট গ্রীষ্মমন্ডলীয় এশিয়ায় সর্বপ্রথম স্থানীয়ভাবে উদ্ভাবিত বাণিজ্যিক হাইব্রিড সবজি বীজ উৎপাদন শুরু করেন। এই জাতগুলি দ্রুত বর্ধনশীল, উচ্চ ফলনশীল এবং স্থানীয় রোগ-বালাই প্রতিরোধী ছিল। উন্নত জাত উদ্ভাবনের পাশাপাশি তিনি এটাও অনুধাবন করতে পেরেছিলেন যে কৃষকদের দোড়গোড়ায় শুধুমাত্র উচ্চমানের বীজের সরবরাহ বাড়ালেই হবেনা, সার্বিক উৎপাদন এবং বীজব্যবসাকে আরও লাভজনক ও টেকসই করার জন্য, তাদেরকে উন্নত সবজি চাষের প্রশিক্ষণ প্রদানও প্রয়োজন। সেলক্ষ্যে স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক এনজিওগুলির সাথে লিয়াঁজো করে, তিনি ইস্ট-ওয়েস্ট সিডের উদ্ভাবনী জ্ঞান বিতরনে প্রোগ্রাম তৈরি করেন যা প্রতিটি বীজ কোম্পানির জন্য অনুসরনীয় হয়ে উঠে। তাঁর সেইদেখানো পথে বীজ কোম্পানীগুলো প্রতি বছর হাজার হাজার কৃষককে সবজি উৎপাদনের উত্তম কৃষিচর্চার প্রশিক্ষণ দেয়। উন্নত বীজ এবং আধুনিক উৎপাদন পদ্ধতি ব্যবহারের ফলস্বরূপ, কৃষকরা তাদের মুনাফায় নাটকীয় পরিবর্তন আনতে সক্ষম হন, এমনকি তাদের আয় দ্বিগুণ বা তিনগুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায় এবং ভোক্তারা স্থানীয় বাজারে এসব উন্নত পুষ্টিকর সবজির সরবরাহ মৌসুমের পাশাপাশি এমনকি অনামৌসুমেও ব্যাপকভাবে দেখতে পান।

সমকালীন কৃষি তথা বীজ বিজ্ঞানের স্বপ্নদ্রষ্টা সাইমন গ্রুট ১৯৩৪ সালে নেদারল্যান্ডসের এনকহাউজেনে জন্মগ্রহণ করেন। এই শহরটি ইউরোপের একটি ঐতিহাসিক বীজ শিল্পকেন্দ্র হিসেবে সমধিক পরিচিত। বিজনেজ ইকনমিক্সে গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করে ১৯৫৮ সালে তিনি তাঁদের ঐতিহ্যবাহী পারিবারিক বীজব্যবসা প্রতিষ্ঠান Sluis & Groot-এ যোগ দেন। যোগদানের অল্প কিছুদিন পর যুক্তরাষ্ট্রের খ্যাতনামা বীজ কোম্পানিতে ফলপ্রসু প্রশিক্ষণ নিয়ে দেশে ফিরে ডাচ বীজ শিল্পে বিপ্লব ঘটান এবং বিশ্বে প্রথম সারির হাইব্রিড ফুলের বীজ উদ্ভাবনকারীদের মধ্যে জায়গা করে নেন। দেশে বীজ ব্যবসায় সাফল্যে উদ্দীপিত হয়ে ১৯৬৫ সালে তিনি প্রথমবারের মতো ব্যবসায়িক সফরে ইন্দোনেশিয়া যান এবং জাকার্তার পাহাড়ি এলাকায় দেখতে পান তাঁর কোম্পানির উদ্ভাবিত উন্নত বাঁধাকপির জাত Glory of Enkhuizen ইউরোপে প্রসিদ্ধ হলেও, ট্রপিক্যাল পরিবেশে তা ব্যর্থ হচ্ছে। তখনই তিনি ট্রপিক্যাল অঞ্চলের জন্য উপযোগী হাইব্রিড জাত তৈরির বিপুল সম্ভাবনার বিষয়টি উপলব্ধি করেন। এই ভাবনা থেকেই ১৯৮২ সালে তিনি বিখ্যাত ফিলিপিনো বীজ ব্যবসায়ী বেনিতো এম. ডোমিঙ্গোর সাথে মিলে প্রতিষ্ঠা করেন বিশ্বখ্যাত ইস্ট-ওয়েস্ট সীড কোম্পানি। তাঁর ভাষায়, “একটি আইডিয়া একেবারে একটি বীজের মতো। ভালো গুণমানের কিছু দিয়ে শুরু করলে তা বিকাশের সম্ভাবনা থাকে, তবে দুটোই যত্ন ও পরিচর্যা দাবি করে।” তিনি তাঁর নব্যপ্রতিষ্টিত কোম্পানিতে নেদারল্যান্ডসে পরীক্ষিত সেসব প্রযুক্তির ব্যবহার করেন যা ৬০ ও ৭০-এর দশকে বীজ শিল্পকে বদলে দিয়েছিল যার ফলস্বরূপ অচীরেই ইস্ট-ওয়েস্ট সীড লক্ষ লক্ষ কৃষকের জীবনমান উন্নয়নে সহায়ক হয়ে উঠেছকৃষিতে সবুজ বিপ্লবের জনক নোবেল বিজয়ী ড. বোরলগের সঙ্গে তাঁর পূর্ব পরিচয় ছিল, তাই তিনি এই বিপ্লব দ্বারা ব্যপকভাবে প্রভাবিত ছিলেন। গ্রুট প্রায়ই বলতেন, “আমরা আরেকটি সবুজ বিপ্লব ঘটাতে পারি, এবার তা হবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এবং এটি হবে সবজিকে কেন্দ্র করে।” কারণ সবজি হলো তুলনামুলকভাবে সস্তা ও গুরুত্বপূর্ণ মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টের উৎস, যা “লুকানো ক্ষুধা” প্রতিরোধ করে যা শিশুদের বুদ্ধিভিত্তিক বিকাশ তথা মানব মস্তিষ্কের বিকাশ বাধাগ্রস্থ করে ফলে জাতির সামাজিক ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি ব্যাহত হয়।ফিলিপাইনে ডোমিঙ্গো বীজ শিল্প, সেখানকার সব কৃষি প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাথে নিবিড়ভাবে জড়িত ছিল আর তার সাথে যুক্ত হয় গ্রুটের ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় বীজ ব্যবসার দুই দশকের অভিজ্ঞতা। এই দুই ভিন্ন পটভূমি থেকে উঠে আসা সমন্বিত প্রতিষ্ঠানটির তাই নাম রাখা হয় ‘ইস্ট-ওয়েস্ট সীড’। বর্তমানে ব্যাংককে সদর দপ্তর থাকা এই কোম্পানিটি ট্রপিক্যাল অঞ্চলের ছোট কৃষকদের জন্য উচ্চমানের সবজির বীজ উদ্ভাবন ও সরবরাহ করে আসছে। ইস্ট-ওয়েস্ট সীড আজ এশিয়ার ট্রপিক্যাল সবজি বীজ বাজারে মহীরূহ রূপে আবির্ভূত এবং আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকাতেও দ্রুত এর বাজার সম্প্রসারিত হচ্ছে। এই কোম্পানি শুধু বীজ নয়, বীজের চূড়ান্ত ব্যবহারকারীদেরকেও তৈরি করছে গ্রটের দেখানো পথে। স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক এনজিওগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করেইস্ট-ওয়েস্ট সীডের নলেজ ট্রান্সফার প্রোগ্রাম চালু করেন গ্রুট, যা প্রতিবছর হাজার হাজার কৃষককে আধুনিক সবজি উৎপাদনের কলাকৌশলের উপর প্রশিক্ষণ দেয়।গ্রুট বিশ্বাস করতেন, ক্ষুদ্র কৃষকরা বিশ্ব খাদ্য নিরাপত্তা বাড়ানোর মূল চালিকাশক্তি এশিয়া ও আফ্রিকার ট্রপিক্যাল অঞ্চলে ৮৮% কৃষক বসবাস করেন এবং তাদেরকেই মূলত ক্রমবর্ধমান বিশ্বজনগোষ্ঠীর খাদ্য চাহিদা পূরণ করতে হবে। তিনি উপলব্ধি করেন- এসব অঞ্চলের ক্ষুদ্রচাষীদের জন্য উপযোগী বীজ উদ্ভাবন না করলে তারা কখনোই উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারবে না। আজ, ইস্ট-ওয়েস্ট সিড এশিয়া, আফ্রিকা এবং ল্যাটিন আমেরিকার ৮০ টিরও বেশি গ্রীষ্মমন্ডলীয় দেশের লক্ষ লক্ষ ক্ষুদ্র কৃষকদের সেবা প্রদান করছে। গ্রুট লক্ষ লক্ষ জীবিকা নির্বাহকারী কৃষককে, যাদের মধ্যে অনেকেই মহিলা, উদ্যান উদ্যোক্তা হিসেবে রূপান্তরিত করার নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাদের জীবিকা এবং আয় ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করেছেন। এই কৃষকরা তাদের সম্প্রদায়ের মধ্যে সবজি ফসলের জন্য গ্রামীণ এবং শহুরে উভয় বাজারকে উজ্জীবিত করেছেন, প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ পরিবারের জন্য পুষ্টিকর সবজি আরও ব্যাপকভাবে সরবরাহ এবং সাশ্রয়ী করে তুলেছেন।

গ্রুট বিশ্ব খাদ্য পুরস্কারের প্রতিষ্ঠাতা নরম্যান বোরলগের মতো কৃষকদের কথা প্রথমে ভেবেছিলেন এবং ক্ষুদ্র কৃষকদের তার ব্যবসার কেন্দ্রবিন্দুতে রেখেছিলেন। তার নিজের ভাষায়: “এটিই আমার প্রথম আবেগ: ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য উন্নত বীজ।” অনেকের কাছেই তিনি অনুপ্রেরণার উৎস, যার মধ্যে অনেক নামকরা স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বীজ ব্যবসায়ী এবং কোম্পানিও আছে যারা বিশ্বের সুবিধাবঞ্চিত অঞ্চলে সবজি প্রজনন শিল্পে প্রবেশের ক্ষেত্রে তার পদাঙ্ক অনুসরণ করে চলেছে। তিনি এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় বীজ সমিতির জনক, প্রতিষ্ঠাতা এবং সক্রিয় সদস্য ছিলেন, সেইসাথে তহবিল এবং দক্ষতার সাথে ওয়ার্ল্ড ভেজিটেবল সেন্টার (পূর্বের AVRDC) কে সহায়তা করার জন্য উদ্ভিজ্জ প্রজননকারীদের একটি কনসোর্টিয়াম গঠন করেছিলেন। গ্রুটকে ফিলিপাইনে রাষ্ট্রীয় সম্মান ‘অর্ডার অফ সিকাতুনা’ প্রদান করা হয়েছিল এবং নেদারল্যান্ডসে রাজকীয় সম্মাননা, ‘অর্ডার অফ অরেঞ্জ-নাসাউ’-এর কর্মকর্তা হিসেবে মনোনীত করা হয়েছিল। “উন্নতমানের বীজের সহজলভ্যতা কৃষিকাজের ভিত্তি, এবং মিঃ গ্রুটের চেয়ে বেশি আবেগের সাথে আর কেউ এই সত্যকে সমর্থন করেনি,” ওয়ার্ল্ড ফুড প্রাইজ ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা থমাস জে. ভিলস্যাক বলেন। “তিনি এমন জায়গায় গিয়েছিলেন যেখানে আগে কোনও বীজ প্রস্তুতকারক যাননি, সবচেয়ে কম সম্পদ এবং সর্বাধিক চাহিদা সম্পন্ন কৃষকদের কাছে পৌঁছেছিলেন। যদিও তিনি আর আমাদের সাথে নেই, তার উত্তরাধিকার বেঁচে আছে প্রতিটি ফসলে যা তিনি বীজ সরবরাহ করতে সাহায্য করেছিলেন এবং বিশ্বজুড়ে কৃষকদের ক্ষমতায়িত করেছিলেন।”গ্রুট বীজ সংরক্ষণ বিষয়ে কোনো রোমান্টিক ধ্যান-ধারণা পোষণ করতেন না। গত বছরের জুন মাসে নিউইয়র্ক টাইমসে লেখা এক চিঠিতে তিনি এই বিষয়টি স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন, যেখানে তিনি “Save Our Food, Free the Seed” শীর্ষক একটি প্রতিবেদনের সমালোচনা করেন। লেখক কর্পোরেট মালিকানার বিরুদ্ধে সমালোচনা করলেও গ্রুট বলেন, এতে বিশ্বজুড়ে কৃষকদের সাধারণ জ্ঞানকে খাটো করে দেখা হয়েছে। তিনি লিখেছেন, “যদিও কর্পোরেট মালিকানার প্রসার, পেটেন্ট আইনের কারণে, আমাদের সামনে একচেটিয়াবাদের মতো বড় চ্যালেঞ্জ হাজির করেছে, তবে এর সমাধান বীজ সংরক্ষণে নয়। ‘বীজ সংরক্ষণ কোনো সর্বজনীন সমাধান নয়’, বরং তা কৃষকের আর্থিক সুযোগ সীমিত করে। নিম্নমানের বীজে সম্পূর্ণ ফসল ধ্বংস হয়ে যেতে পারে, বিপরীতে উন্নত জাতের বীজ

ফসলের উৎপাদন ও পুষ্টিগুণ বাড়ায়… খরা, রোগ ও পোকামাকড়ের প্রতিরোধ গড়ে তোলে যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বিশ্বজুড়ে দুই বিলিয়ন মানুষ কৃষির ওপর নির্ভরশীল।” এই গভীর উপলব্ধিই তাঁকে বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার “ওয়ার্ল্ড ফুড প্রাইজ”-এর ৪৯তম বিজয়ী হিসেবে নির্বাচিত করেছে, যা ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে তাঁর বীজ উন্নয়ন বিষয়ক অভিজ্ঞতার স্বীকৃতি। কৃষির নোবেল খ্যাত এই পুরস্কারের আর্থিক মূল্য ২,৫০,০০০ মার্কিন ডলার এবং এটি তাদের প্রদান করা হয় যারা খাদ্যমান, উৎপাদন বা প্রাপ্যতা বৃদ্ধির মাধ্যমে মানব উন্নয়নে অসাধারণ অবদান রেখেছেন। আইওয়া সরকার, আইওয়া ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট অথরিটি এবং বায়ার ক্রপসায়েন্স, জন ডিয়ার ফাউন্ডেশন, রকফেলার ফাউন্ডেশন, ব্যাংকারস ট্রাস্ট, কোর্টেভা এবং রুয়ান ট্রান্সপোর্টেশনের মতো বেশ কিছু বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান ও এনজিও এই ফাউন্ডেশনকে সহায়তা করে। গ্রুটের নাম ঘোষণাটি ছিল বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ, যা ১০ জুন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র সচিব মাইক পম্পেও ও ফাউন্ডেশনের প্রেসিডেন্ট কেনেথ এম. কুইনের যৌথ ঘোষণায় প্রকাশিত হয়। গ্রুট মনে করেন যে এই পুরষ্কারটি কেবল তাকেই নয়, লক্ষ লক্ষ ক্ষুদ্র কৃষককে সম্মানিত করে যারা বেঁচে থাকার জন্য কৃষিকাজ থেকে টেকসই ব্যবসা গড়ে তোলার দিকে এগিয়ে গেছেন: “সফল ফসলের পরে তাদের হাসি দেখাই আমার একমাত্র পুরষ্কার। সেই কারণে, আমি এই বিশ্ব খাদ্য পুরষ্কার তাদের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করছি।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর
এক ক্লিকে বিভাগের খবর