ছোট গল্প
বিউটি দাশ
একদিন মধ্য দুপুরে নির্জন স্থান দিয়ে একাকি নৌকায় করে নদী পার হচ্ছিল এক নারী। কোথায় যাচ্ছিল? কেন যাচ্ছিল? সে নিজেও জানে না! নৌকা চলছে ঠিকই কিন্তু মাঝিকেও সে দেখতে পাচ্ছিল না! খুবই একাকী নির্জন মনোহর পরিবেশে নৌকায় সে গভীর প্রকৃতিক অপূর্বতায় যেন মগ্ন ছিল। প্রথমে পূর্ব দিকে নৌকাটি যাচ্ছিল হঠাৎ কিভাবে যেন দক্ষিণ দিকে ঘুরে নৌকাটি নদীর মাঝখানে হয়ে গেল চোখের পলকে! এমন সময় নৌকায় এক মহা তপস্যী পুরুষ! গায়ে সাদা পোশাক, বাম হাতে একটা কমন্ডুল, কমুন্ডুল থেকে জল ঢেলে নারীটির গায়ে একটু দিতেই সাথে সাথে নীরাটিকে তার বক্ষে জড়িয়ে নিয়ে কপালে এক আশীর্বাদসম স্পর্শ
স্পর্শের সাথে সাথে নারীটি এক ভাষাহীন স্বর্গসুখ অনুভব হতে লাগল! এমন সময় নৌকাটি পাহাড়ের অগ্নিকর্ণার বরাবর গিয়ে ঠেকল। দেখে নৌকায় সে একা! দাঁড়িয়ে রইল!
প্রশ্ন জাগছে মনে শত শত “নারীটির”
দর্শন-প্রশ্ন- উত্তর! অদৃশ্য আত্মায়- আত্মায়!
এরূপ নির্দয় করুনহীন হৃদয় আপনার!
না।
তবে কিরূপে আপনি এতো নিষ্ঠুর জীবন দিলেন আমাকে আপন সৃষ্টিতে?
সঠিক সময়ে তুমি সব সত্যি সম্পর্কে অবগত হবে।
সময়? হা হা হা। কি আশ্চর্য! জীবনের শেষ প্রান্তে, এরূপ দুঃসময়ে দাঁড়িয়েও আপনি আবার সময়ের কথা বলেন!
জন্ম থেকে তো এইটুকু চাওয়া ছিল মাত্র —–
আমি ঐশ্বর্যহীন। এক সাধারণ জীবন যাপন করবো মর্ত্যে এই অপূর্ব- মায়াবী পৃথিবীতে। সম্পূর্ণ প্রেম মায়ায়ঘেরা একটি স্বাভাবিক জীবন। আমি তো প্রহর সূর্য্যে তাপে এক ফোঁটা ক্লান্তির ঘামে তৃষ্ণা নিবারণ-কুঁড়ে ঘরে প্রেমের অলংকারে চন্দ্রের শীতলতায় ঘুমাতে চেয়েছিলাম। জন্মব্দি আমার হৃদয় প্রার্থনা “আপনার হৃদয় দরবারে” নিবেদন করেছিলাম।
-তবে কোন প্রকারে আপনি এরূপ নির্মম প্রাসাদি “মমিজীবন” আমায় এই মর্ত্যে দিলেন?
কি প্রকারে এরূপ হৃদয়হীন কঠোর নিয়তি নির্মাণ করতে পারলেন আমার বিধিতে?
তবে কি আপনার হৃদয়ই নেই!
জন্ম-মৃত্যু মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কি জীবন দিলেন?
আপনি চাইলে হলাহল পূর্ণ এক হৃদয় সৃষ্টি করতে পারতেন আমার দেহ-আপন ভূবনে।
কিন্তু আপনি করেছেনটা কি!
আপনার সম্পূর্ণ প্রেম হৃদয় থেকে পরিপূর্ণ রূপে সৃষ্টি করেছেন আমায়।
কিন্তু! প্রেমহীন এক মরুভূমিসম জীবন দান করলেন!
আমার হৃদয়ের প্রেম হৃদয়ে হত্যা করে দিতে পারতেন। যেমনটা ভ্রুণ হত্যা করে মাতৃগর্ভ এই মর্ত্যের—- মানুষ। তার পরিবর্তে বিপরিত ক্রিয়াই করেছেন! আগ্নেয়গিরির লাভার মতো নিরব সংগোপনে জন্ম-মৃত্যু অব্দি অনির্বাণ রেখেছেন জ্বলন্ত!
তবে কেন?
স্থানে স্থানে আপন হৃদয়ে প্রেম- মায়া সৃষ্টি- আধিপত্যের জন্য?
হে
এতো নির্দয় আপনি! যার হৃদয়ে এতো গভীর প্রেমদান করলেন অথচ তার জীবনে প্রেমের প্রবেশ নিষিদ্ধ করে দিলেন!
এরূপ নির্ণয়ের কারণ কি? কি কারণে আপনি এরূপ নির্ণয় নিলেন? অথবা আপনাকে নিতে হলো?
আমার মুখ, স্তব্ধ করে আপনার নিয়মে হাত পা বন্দী করে, কোন দায়ে? দায়ভার কার? সম্পূর্ণ কি আমার?
তোমার হৃদয়প্রেমের প্রাপ্তি তুমি অবশ্য পাবে।
হা হা হা! লজ্জার প্রেম আঁখিতে আবরণ সৃষ্টি করে, হলো রাখা!
যৌবনের প্রেম জলে পাথর করে! এখন অভিশপ্ত আঁখিতে কি আপনি প্রেম দৃষ্টি দান করবেন?
যে আঁখি- হৃদয়কে পাথর পরিণত করেছি কেবল অভিশপ্ত দৃষ্টি নির্গত হবে সে আঁখি- হৃদয়ে? অর্থাৎ অগ্নিতে?
না।
তবে তাৎপর্য?
আমার জীবন-আপন ভূবনে,
আমি কোন প্রকার পরোক্ষভাবে নয়, প্রত্যেক্ষভাবে শুনতে ও দর্শন করতে চাই। আমার জীবন- হৃদয়কে এরূপ নির্দয়-করুণাহীন ভাবে নির্মাণের তাৎপর্য কি?
★তবে শোনো, প্রেম হৃদয় সমুদ্রে “বর্তমান” সাধারণ মানুষ” পাড়ি দিয়ে কূলে পৌঁছাতে অক্ষমতার ভূমিকা রাখছে প্রতিনিয়ত। এতে সমুদ্রের তলানিতে পতিত হচ্ছে প্রেমহৃদয় একাকি।
আমি মানি না আপনার এই বাণী।
তবে দর্শন করো।
-এরূপ বেহুশ মানুষ কি করে হয়!
চারিদিকে মানুষের কি আর্ৎনাদ !
মৃত্তিকা-আকাশ পর্যন্ত অগ্নির গ্রাসে! মৃত- অর্ধপোড়া মানুষ- শিশুদের শ্বাসরুদ্ধ ক্রন্দন যেন রোমসভ্যতা নয়! ত্রিভুবনে থেকে ক্রন্দনের অশ্রু ঝরছে সমুদ্র গড়ছে এই মৃত্তিকা থেকে আজ!
এমন হৃদয় বিদারক পরিস্থিতি “সে” কি করে পারছে প্রেমের বাঁশি বাজিয়ে যেতে!
এই মানুষই নয়।
এর তো এই জগৎ সম্পর্কে কোন চেতনাই নাই
তবে জ্ঞাত হলো, অবশেষে তোমার, দেবী?
★ অনুরূপ তুমিও তাই করতে।
আমি বিশ্বাস করি না আমি এরূপ অপদার্থের মতো জাগতিক
জীবনে ঘুমের নেশায় ন্যায় কুম্ভকর্ণের মতো এরূপ অচেতন বেহুশ থাকব আর না থাকতে পারি!
★হে, ওটা তুমিই ছিলে।
-আমি মানি না।
★কেন?
কারণ সর্বপ্রথম মানুষ আমি তাই।
একটা মানুষের জীবন শুধু প্রেমের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। জাগতিক জীবনে তাঁর বহু দায়-দায়িত্ব কর্তব্য থাকে তাই।
★ রোমসভ্যতার ১০০ তলা প্রাসাদ যখন পুড়ে দাউ দাউ হচ্ছিল। মানুষ- পশুপাখি- প্রকৃতি বিশ্ব- আর্তচিৎকারে ত্রিভুবন কাঁদছিল——-
এরূপ ত্রিভুবন মর্মান্তিক
পরিস্থিতিতে, তখনও! যে প্রেমে মগ্ন থেকে প্রেমের বাঁশী বাজাচ্ছিল সে কি মানুষ ছিল না?
★ মৌন কেন তুমি? দেবী?
অনুরূপ দৃষ্টান্ত তুমিও করতে।
তাই আমাকে তোমার জন্য এরূপ জীবনের নির্ণয় নিতে হয়েছে আপন সৃষ্টিতে। “প্রথমত”।
দ্বিতীয়ত- প্রেমহীন হৃদয়। কোন সৃষ্টি-রক্ষা তো দূরের কথা।—- সম্ভব নয়।
কেবল ধ্বংস লীলা চালাতে পারে।
এই সময় নদী তুমি বয়ে যাওয়াই তোমার কাজ——
পৃথিবীতে কি মানুষ প্রেম— সব করছে না?
★তুমি পারতে না—
তাহলে আপনি যে বললেন –আমার হৃদয়প্রেম —পাব।
★দর্শন করো।
কি অপূর্ব -মায়াবী এই পরিবেশ! যেন কারো মায়া দ্বারা সৃষ্ট! এতো মনোহর! কি অপরূপ সৌন্দর্য্য এই সরোবর! স্বচ্ছ টলটলে সরোবরে ফুটন্ত পদ্মে! পদ্মগুলো ভাসমান- ডুবে আবার ফোঁটে আচার্যজনক! যেন কোন সংকেত রেখা তুলছে! কিন্তু এরূপ মায়া সৃষ্টি অপরুপ-নির্জন পরিবেশে সরোবরের– কর্ণারে কে এই ফেরেস্তাসম মহাপুরুষ? এভাবে রযেছেন একাকিত্বে যেন অনন্ত কাল ধরে?
এর পূর্ব তো দেখেছি বলে স্মরণে আসছে না।
কিন্তু উনি একা কেন দাঁড়িয়ে রয়েছেন এভাবে! মনে হয় যেন শতবর্ষ ধরে এভাবেই রয়েছেন একাকি দাঁড়িয়ে ! কারো বিচ্ছেদের বিরহ! “তবু”! যেন প্রতীক্ষায়!—–?
★হে।
কেন?
★তোমারি জন্য।
আমারি জন্য!
অপেক্ষামান নয় প্রতীকমান।।
নিমিষেই অদৃশ্য! তাকিয়ে দেখি শূন্য আমার চারপাশ! একাকি রইলাম দাঁড়িয়ে সেথায় দীর্ঘক্ষণ- দীর্ঘশ্বাঃসে।
সমাপ্তির ইতি।