নজমুল হক, স্টাফ রিপোর্টার গাজীপুর
বাংলাদেশে শিক্ষার অগ্রযাত্রা দৃশ্যমান হলেও এখনও বিপুল সংখ্যক মানুষ নানা প্রতিকূলতায় শিক্ষার মূলধারা থেকে ছিটকে পড়ে। দারিদ্র্য, পারিবারিক দায়িত্ব, অকাল উপার্জনের চাপ, ভৌগোলিক দূরত্ব কিংবা সামাজিক প্রতিবন্ধকতা—এসব কারণ অনেকের স্বপ্ন থামিয়ে দেয় মাঝপথেই। এই প্রেক্ষাপটে শিক্ষায় পিছিয়ে পড়াদের জন্য যে প্রতিষ্ঠানটি নীরবে, ধারাবাহিকভাবে সহযাত্রীর ভূমিকা পালন করছে, সেটি হলো বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় (বাউবি)। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম সারাদেশব্যাপী ১২টি আঞ্চলিক ও ৮০টি উপআঞ্চলিক কেন্দ্রের মাধ্যমে প্রায় ১৮০০টি স্টাডি সেন্টারে এবং প্রবাসী অধ্যুষিত বিশ্বের ৭টি দেশে চলমান। তাই এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস হলো পুরো বাংলাদেশ এবং দেশের বাইরেও।
বাউবির মূল দর্শনই হলো—শিক্ষা হবে সবার জন্য, যেকোনো সময় ও যেকোনো বয়সে। নিয়ম নীতির বেড়াজালে কর্মজীবী, গৃহিণী বা বয়স্ক মানুষের পক্ষে প্রচলিত বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করা সম্ভব নয়। বাউবি সেই সীমাবদ্ধতা ভেঙে নমনীয় পদ্ধতিতে শিক্ষা প্রদান করছে। স্বশিক্ষা উপকরণ, নির্ধারিত টিউটোরিয়াল ক্লাস, অডিও-ভিডিও সাপোর্ট, আঞ্চলিক ও উপআঞ্চলিক কেন্দ্রের সহায়তা এবং পরীক্ষাভিত্তিক মূল্যায়ন—সব মিলিয়ে এটি এমন এক ব্যবস্থা, যেখানে শিক্ষার্থী নিজের বাস্তবতার সঙ্গে সমন্বয় করে এগোতে পারেন। এ বিশ্ববিদ্যালয়ে সাতটি স্কুল/অনুষদ রয়েছে। এই অনুষদগুলোর মাধ্যমে এসএসসি থেকে শুরু করে পিএইচডি পর্যন্ত ৫৫টি শিক্ষা প্রোগ্রামের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
গ্রামবাংলার অনেক তরুণ-তরুণী এসএসসি বা এইচএসসি পর্যায়ে ঝরে পড়ে। কেউ আর্থিক সংকটে, কেউ পারিবারিক চাপে। তাদের জন্য বাউবির ওপেন স্কুলের কার্যক্রম দ্বিতীয় সুযোগের দরজা খুলে দিয়েছে। একইভাবে অন্যান্য অনুষদ থেকে পরিচালিত সার্টিফিকেট, ডিপ্লোমা, স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের বিভিন্ন প্রোগ্রাম কর্মজীবীদের দক্ষতা বৃদ্ধি ও পদোন্নতিতে সহায়তা করছে। ফলে শিক্ষা আর বিলাসিতা নয়; এটি হয়ে উঠছে আত্মোন্নয়নের বাস্তব হাতিয়ার।বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, বাউবি নারী শিক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। অনেক নারী, যারা বিয়ে বা মাতৃত্বের কারণে নিয়মিত শিক্ষায় বিরতি নিতে বাধ্য হয়েছেন, তারা ঘরে বসেই পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারছেন। এতে নারীর ক্ষমতায়ন যেমন বাড়ছে, তেমনি পারিবারিক ও সামাজিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের অংশগ্রহণও শক্তিশালী হচ্ছে। একই সঙ্গে তৃতীয় লিঙ্গের নাগরিক, প্রবাসফেরত শ্রমিক বা চাকরিজীবীরাও নিজেদের শিক্ষাগত যোগ্যতা উন্নত করে নতুন কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের সুযোগ পাচ্ছেন।তথ্যপ্রযুক্তির বিকাশ বাউবির কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করেছে। অনলাইন ক্লাস, ডিজিটাল কনটেন্ট, অডিও-ভিডিও লেকচার এবং ই-লার্নিং প্ল্যাটফর্ম শিক্ষার্থীদের শেখার অভিজ্ঞতাকে আধুনিক ও সহজলভ্য করেছে। কোভিড-১৯ মহামারির সময় যখন প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থা স্থবির হয়ে পড়েছিল, তখন বাউবি’র দূরশিক্ষা মডেল বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অনুসরণ করেছে। এই অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে—ভবিষ্যতের শিক্ষা হবে প্রযুক্তিনির্ভর, নমনীয় এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক; আর সে পথেই এগিয়ে আছে বাউবি।তবে চ্যালেঞ্জও রয়ে গেছে। অনেক অঞ্চলে ইন্টারনেট সুবিধার সীমাবদ্ধতা, প্রযুক্তিগত দক্ষতার অভাব এবং আঞ্চলিক ও উপআঞ্চলিক কেন্দ্রগুলোর অবকাঠামোগত দুর্বলতা শিক্ষার্থীদের পূর্ণ সম্ভাবনা অর্জনে বাঁধা সৃষ্টি করে। পাশাপাশি দূরশিক্ষা সম্পর্কে সামাজিক কিছু ভুল ধারণাও রয়েছে, যা শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাসে প্রভাব ফেলে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রয়োজন আরও বিনিয়োগ, প্রশিক্ষিত জনবল এবং মানসম্মত পাঠ্যসামগ্রী উন্নয়ন। নীতিনির্ধারকদের উচিত বাউবিকে কেবল বিকল্প নয়, বরং মূলধারার পরিপূরক শক্তি হিসেবে বিবেচনা করা। শিল্পখাতের সঙ্গে সমন্বয় করে দক্ষতাভিত্তিক কোর্স চালু করা, প্রযুক্তি সহায়তা তহবিল গঠন, এবং গবেষণা কার্যক্রম সম্প্রসারণের মাধ্যমে বাউবিকে আরও কার্যকর করা সম্ভব। বিশেষ করে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে আজীবন শিক্ষার ধারণা বাস্তবায়নে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্ব অপরিসীম।
শিক্ষা কেবল ডিগ্রি অর্জনের বিষয় নয়; এটি আত্মমর্যাদা ও সামাজিক স্বীকৃতির পথ। যে মানুষ একসময় আর্থিক বা সামাজিক কারণে পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছিলেন, তিনি যদি বাউবি’র মাধ্যমে আবার শিক্ষায় ফিরে এসে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন—তাহলে সেটি সমাজের জন্য এক ইতিবাচক বার্তা। বাউবি সেই স্বপ্নযাত্রার সহযাত্রী, যে প্রতিষ্ঠান বিশ্বাস করে—শিক্ষা থেমে থাকে না, সুযোগ পেলেই মানুষ আবারও এগিয়ে যায়।
শিক্ষায় পিছিয়ে পড়াদের পাশে থেকে আলোকিত ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে নেওয়ার এই প্রচেষ্টা আরও বিস্তৃত ও শক্তিশালী হোক—এটাই সময়ের দাবি।