নজমুল হক স্টাফ রিপোর্টার গাজীপুর
উচ্চ শিক্ষা কোনো জাতির মেধা, মনন ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। একটি দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শুধু ডিগ্রি প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান নয়; এগুলো জ্ঞানচর্চা, গবেষণা, মুক্তচিন্তা ও মানবিক মূল্যবোধ গঠনের কেন্দ্র। কিন্তু যখন জ্ঞানচর্চার পরিবেশ অনাকাঙ্খিত বিভিন্ন প্রভাবের ছায়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে, তখন উচ্চ শিক্ষার মূল উদ্দেশ্যই প্রশ্নের মুখে পড়ে। বাংলাদেশে উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে এই বাস্তবতা নিয়ে উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে। বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ঐতিহাসিকভাবে সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার আন্দোলন কিংবা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। এই ঐতিহ্য বিশ্ববিদ্যালয়কে সমাজ পরিবর্তনের শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। কিন্তু সেই ইতিবাচক রাজনৈতিক চর্চা ধীরে ধীরে অনেক ক্ষেত্রে অনাকাঙ্খিত আধিপত্য, প্রভাব বিস্তার এবং স্বার্থের দ্বন্দ্বে রূপ নিয়েছে বলে সমালোচনা রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল শক্তি হওয়ার কথা জ্ঞান, গবেষণা ও সৃজনশীলতা। কিন্তু যখন শিক্ষক নিয়োগ, পদোন্নতি বা প্রশাসনিক দায়িত্ব বণ্টনের ক্ষেত্রে অনাকাঙ্খিত আনুগত্যকে গুরুত্ব দেওয়ার অভিযোগ ওঠে, তখন মেধার মূল্যায়ন বাধাগ্রস্ত হয়। অনেক ক্ষেত্রে যোগ্যতার চেয়ে রাজনৈতিক পরিচয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া হলে একাডেমিক পরিবেশ দুর্বল হয়ে পড়ে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞানচর্চার ধারাবাহিকতা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা গড়ে ওঠা কঠিন হয়ে পড়ে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দীর্ঘদিন ধরে ছাত্ররাজনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা পাশাপাশি চলছে। তবে সমস্যা দেখা দেয় তখনই, যখন সুস্থ রাজনৈতিক চর্চা ক্ষমতার প্রতিযোগিতা বা প্রভাব বিস্তারের রূপ নেয় এবং একাডেমিক পরিবেশকে প্রভাবিত করে। অনাকাঙ্খিত প্রভাবের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ছাত্ররাজনীতি। ছাত্ররাজনীতি গণতান্ত্রিক নেতৃত্ব গড়ে তোলার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হতে পারে। কিন্তু যখন এটি সহিংসতা, দখলদারিত্ব কিংবা আধিপত্যের রাজনীতিতে পরিণত হয়, তখন তা শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রমকে ব্যাহত করে। অনেক সময় ক্লাস বন্ধ, সেশনজট কিংবা ক্যাম্পাসে অস্থিরতার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়, যার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হয় সাধারণ শিক্ষার্থীরা।
এছাড়া একাডেমিক স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কাও অনেক সময় দেখা যায়। শিক্ষক ও গবেষকদের স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ, গবেষণা ও সমালোচনার সুযোগ থাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণশক্তি। যদি কোনো কারণে তারা রাজনৈতিক চাপ বা আত্মসংযমের মধ্যে কাজ করতে বাধ্য হন, তাহলে জ্ঞানচর্চার পরিসর সংকুচিত হয়ে পড়ে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় তার মৌলিক বৈশিষ্ট্য—মুক্তচিন্তার ক্ষেত্র হিসেবে দুর্বল হয়ে যায়।
তবে বাস্তবতা হলো, রাজনীতি ও বিশ্ববিদ্যালয়কে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব নয় এবং তা কাম্যও নয়। বিশ্ববিদ্যালয় সমাজের অংশ; এখানে সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা ও মতবিনিময় হওয়া স্বাভাবিক। বরং প্রয়োজন হলো এমন একটি পরিবেশ, যেখানে মতভেদ থাকবে কিন্তু সহিংসতা থাকবে না, রাজনৈতিক সচেতনতা থাকবে কিন্তু অনাকাঙ্খিত আধিপত্য থাকবে না।
উচ্চ শিক্ষাকে শক্তিশালী করতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বিবেচনা করা জরুরি। প্রথমত, শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতিতে কঠোরভাবে মেধা, গবেষণা ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কোনো ধরনের অনাকাঙ্খিত প্রভাব সিদ্ধান্ত গ্রহণকে প্রভাবিত করতে না পারে। তৃতীয়ত, ছাত্ররাজনীতিকে সহনশীল ও নীতিনির্ভর করতে রাজনৈতিক দলগুলোরও দায়িত্বশীল ভূমিকা থাকতে হবে। এছাড়া গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি। আধুনিক গবেষণাগার, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, উন্নত লাইব্রেরি এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধ, সহনশীলতা ও গণতান্ত্রিক চেতনা গড়ে তোলার জন্য সহশিক্ষা কার্যক্রমের প্রসারও গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের নতুন সম্ভাবনার পথে এগিয়ে যাচ্ছে। এই অগ্রযাত্রায় দক্ষ ও সৃজনশীল মানবসম্পদ তৈরি করা ছাড়া বিকল্প নেই। সেই লক্ষ্য পূরণে উচ্চ শিক্ষার মান নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। যদি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো জ্ঞানকে প্রাধান্য দিয়ে অনাকাঙ্খিত প্রভাব থেকে মুক্ত একটি স্বাস্থ্যকর একাডেমিক পরিবেশ গড়ে তুলতে পারে, তবে দেশ উপকৃত হবে দীর্ঘমেয়াদে। জ্ঞান বনাম অনাকাঙ্খিত প্রভাবের এই দ্বন্দ্বে জয়ী হওয়া উচিত জ্ঞানেরই। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত শক্তি কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ে নয়, বরং মুক্তচিন্তা, গবেষণা ও মানবিক মূল্যবোধে। যখন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সেই আদর্শে পরিচালিত হবে, তখনই উচ্চ শিক্ষা সত্যিকার অর্থে জাতির অগ্রগতির পথপ্রদর্শক হয়ে উঠবে।