সামসুল হক জুয়েল
গাজীপুরের কালীগঞ্জে পৌষ সংক্রান্তির ঐতিহ্যবাহী মাছের মেলা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বুধবার (১৪ জানুয়ারি) সকাল থেকে শুরু হয়ে দিনব্যাপী চলে এ মেলা। মেলার প্রধান আকর্ষণ থাকে এলাকার জামাইদেরর বড় মাছ কেনার প্রতিযোগিতা। এ মেলায় শশুর-জামাইরা প্রতিযোগিতা করে বড় মাছ কিনে। এমনই এক জামাইকে দেখা যায় ৩৫ কেজি ওজনের কাতল মাছ ৪০ হাজার টাকা দিয়ে কিনে উল্লাস করতে। গাজীপুরের কালিয়াকৈর থেকে আসা মৎস ব্যবসায়ী সজীব জানান, কাতল, বোয়াল, আইড়, চিতল, বরশোলসহ বিভিন্ন প্রজাতির প্রায় ৫লাখ টাকার মাছ নিয়ে মেলায় পশরা সাজিয়েছেন তিনি। বিশ বছর যাবত এ মেলায় মাছ বেচার অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। এছাড়া ঢাকার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার সায়েদ আলী সুপার মার্কেটের নাইম ফিসের মালিক নাইম মিয়া তিনটি বড় কাতল, আইড়, বোয়াল সহ নানা প্রজাতির প্রায় ১০ লক্ষ টাকার মাছ নিয়ে মেলায় এসেছেন তিনি। ঢাকার ডেমরা এলাকার মৎস ব্যবসায়ী সুমন ২৫-৩০ কেজির কয়েকটি কাতল সহ বাহারি প্রায় ৭ লক্ষ টাকার মাছ নিয়ে এসেছেন মেলায়। এসব মৎস ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলে জানাযায়, তারা মেলায় ১৫ থেকে ২০ বছর যাবত মাছ বিক্রি করছেন। মেলাটি উপজেলার জামালপুর, জাঙ্গালীয়া ও বক্তারপুর ইউনিয়নের ত্রিমোহনার কাপাইশ গ্রামে প্রতি বছর পৌষ মাসের শেষে মাঘ মাসের প্রথমদিন অনুষ্ঠিত হয়। প্রচলিত রয়েছে এ মেলায় জামাই ও শশুরেরা প্রতিযোগিতা করে বড় মাছ কেনেন। মেলা উপলক্ষে পুরো এলাকায় মেহমান ও মানুষের ঢল নামে। অনেকে আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে আসেন। যে জামাই যত বড় মাছ কিনে শশুরবাড়ি নিতে পারেন তার বাহবা তত বেশি। গাজীপুরের জয়দেপুর থেকে আসা আনোয়ার হোসেন জানান, তিনি ৩২ কেজির একটি কাতল কিনেছেন। মেঘনা নদীর কাতল মাছটি পার্শ্ববর্তী নরসিংদী জেলার পলাশ উপজেলার খানেপুর বাজারের ব্যবসায়ী রঞ্জিত বর্মণের কাছ থেকে ৩৫ হাজার টাকায় কেনেন। বছরে একবারের এ মেলায় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মাছ ক্রেতা, বিক্রেতা ও দর্শনার্থীরা আসেন । মেলায় ভারত, বারমাসহ দেশের নানা এলাকার সামুদ্র, নদী ও খামার থেকে রুই, কাতল, চিতল, বোয়াল, আইর, পানপাতা, ইলিশ, রুপচাঁদা, কাইকা, বাইম, গলদা ও বাগদা চিংড়িসহ নানান জাতের বড় বড় মাছ আসে। মাছের পাশাপাশি কাঠের তৈরি আসবাব, গৃহস্থালির জিনিসপত্র, বাচ্চাদের খেলনা, হরেক রকম মিষ্টি , জিলেপি, তিলা, কদমা, ফল, কাঁচা তরকারি, খাবারের দোকানসহ নানান জিনিস পত্রের পশরা সাজান দোকানিরা। একদিনের মেলায় কযেক কোটি টাকা বিক্রির সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। মেলায় বিনোদনের জন্য পাশের গ্রামের চুপাইর উচ্চ বিদ্যালয়ে এর একটি অংশ হিসেবে নানান দোকানের পাশাপাশি নাগরদোলা, চরকি, বাচ্চাদেরর ছোট চলন্ত ট্রেন, নৌকা, যাদুঘর ইত্যাদি তিন দিন পর্যন্ত অবস্থান করে। এবছর মেলার আয়োজক কমিটির সভাপতি মাওলানা আলী হোসেন জানান, মেলাটি প্রায় আড়াই থেকে ৩ শত বছর ধরে চলে আসছে। এ মেলা প্রতি বছর পৌষ মাস শেষে পহেলা মাঘ অনুষ্ঠিত হয়। তাই একে পৌষ সংক্রান্তির মেলা বলে। তবে মেলায় এলাকার জামাইরা বড় বড় মাছ কিনে বলে একে জামাই মেলা বলে। তাছাড়া এ মেলায় মানুষ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ কেনার উদ্দেশ্যে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসে বলে একে মাছের মেলাও বলে। মেলা উপলক্ষে এলাকার চার পাঁচ গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে মেহমানরা আসেন। এতে আত্মীয়তার সম্পর্ক সুদৃঢ় হয়। এখানে যেসব মাছ আসে তা হাট-বাজারে খুব কম দেখা যায়। মেলা উপলক্ষে বড় বড় মাছ নিয়ে আসে বিক্রেতারা। দেশ ও বিদেশের নানান প্রজাতির এসব মাছ ভালো দামে কেনা বেচা করতে পারে ক্রেতা বিক্রেতারা। অনেকেই একবছর আগ্রহে থাকে মেলা থেকে বড় মাছ নিয়ে আসবে বলে।উল্যেখ্য, মেলাটি যখন শুরু হয় তখন এটি বিনিরাইল গ্রামের শেষ প্রান্তে হতো, তখন মেলার পাশেই হিজল গাছের তলায় হিন্দু সম্প্রদায়ের পূজা অর্চনা হতো।সময়ের বিবর্তনে মেলাটি ৫ শতফুট পূর্বে কাপাইশ মের শেষ প্রান্তে অনুষ্ঠিত হয়। এখন মেলা অনুষ্ঠিত হওয়ার জায়গায় পূজা অর্চনা না হলেও যেখানে মেলাটি শুরু হয়েছিল সেই বিনিরাইলের হিজল তলায় এখনো পূজা অর্চনা হয়।