নজমুল হক, স্টাফ রিপোর্টার গাজীপুর
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কিছু নির্বাচন কেবল ক্ষমতার পালাবদল নয়- সেগুলো হয়ে ওঠে জনমতের বিস্ফোরণ, সময়ের মোড় ঘোরানো মুহূর্ত। সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)’র বিজয় তেমনই এক অধ্যায়ের সূচনা করেছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক টানাপোড়েন, আন্দোলন-সংগ্রাম, বিতর্ক ও অনাস্থার আবহ পেরিয়ে ভোটের ঝড়ে যে রায় এসেছে, তা বাংলাদেশের জনগণের কাছে ‘নতুন ভোর’- এর প্রতীক। নির্বাচনের আগে দেশজুড়ে ছিল উত্তেজনা ও শঙ্কা। ভোটের দিন সকাল থেকেই কেন্দ্রগুলোতে দীর্ঘ লাইন, তরুণ ভোটারদের অংশগ্রহণ এবং নারীদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি একটি বার্তা দিয়েছে- মানুষ পরিবর্তন চায় এবং সেই পরিবর্তন তারা ব্যালটের মাধ্যমে আনতে প্রস্তুত। বিভিন্ন পর্যবেক্ষক সংস্থার প্রাথমিক হিসাবে ভোটার উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য। গ্রাম ও শহর উভয় ক্ষেত্রেই বিএনপির প্রার্থীরা শক্ত অবস্থান তৈরি করেন। এই ফলাফল শুধু একটি দলের জয় নয়, এটি জনমতের এক সুস্পষ্ট উচ্চারণ। জনগণ তাদের প্রত্যাশা, হতাশা এবং ভবিষ্যৎ আকাঙ্ক্ষা একত্রে প্রকাশ করেছে ভোটের মাধ্যমে।
বিএনপি তাদের নির্বাচনী প্রচারণায় যে প্রতিশ্রুতিগুলো সামনে এনেছিল- সুশাসন, প্রশাসনিক সংস্কার, নির্বাচন ব্যবস্থার পুনর্গঠন, মানবাধিকার রক্ষা ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার- তা ভোটারদের বড় অংশকে প্রভাবিত করেছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও প্রযুক্তিনির্ভর উন্নয়নের অঙ্গীকারে আস্থা দেখিয়েছে। দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান বারবার বলেছেন, ‘প্রতিহিংসার রাজনীতি নয়, পুনর্গঠনের রাজনীতি’—এই স্লোগান ভোটের মাঠে নতুন মাত্রা যোগ করে। নির্বাচনী প্রচারণায় মাঠপর্যায়ের সংগঠনের সক্রিয়তা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমর্থকদের প্রচারণাও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে বিরাজমান মেরুকরণ এই নির্বাচনের ফলাফলের মাধ্যমে নতুন বাস্তবতায় প্রবেশ করেছে। বিরোধী শক্তি থেকে ক্ষমতায় আসা একটি দলের সামনে যেমন সুযোগ থাকে, তেমনি থাকে দায়িত্বের ভার। জনগণ যে প্রত্যাশা নিয়ে বিএনপিকে দায়িত্ব দিয়েছে, তা পূরণ করা সহজ কাজ নয়। এই বিজয় দেশের গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন, প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ভোট এবং শান্তিপূর্ণ ফলাফল- এসবই একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রাণশক্তি। এখন প্রশ্ন- এই জনরায়কে কতটা ইতিবাচক সংস্কারে রূপান্তর করা যায়? নতুন সরকারের সামনে প্রথম চ্যালেঞ্জ হবে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা। মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ- এসব ক্ষেত্রে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। পাশাপাশি প্রশাসনিক কাঠামোকে গতিশীল ও জবাবদিহিমূলক করা জরুরি।
দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, সরকারি ব্যয়ে স্বচ্ছতা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি- এসবই এখন সময়ের দাবি। জনগণ যে আশা নিয়ে ভোট দিয়েছে, তা বাস্তবায়নে দ্রুত দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া নতুন সরকারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নির্বাচনের ফলাফল আন্তর্জাতিক মহলেও আগ্রহের সঙ্গে পর্যবেক্ষিত হয়েছে। আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তিগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া এখন কূটনৈতিক অগ্রাধিকারের বিষয়। নতুন সরকার যদি স্থিতিশীলতা ও সংস্কারের বার্তা দিতে পারে, তবে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও বিনিয়োগের পথ আরও সুগম হতে পারে।
ঐতিহাসিক বিজয়ের উচ্ছ্বাস যেমন আছে, তেমনি রয়েছে কঠিন বাস্তবতা। নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়ন, রাজনৈতিক সহনশীলতা বজায় রাখা এবং বিরোধী মতের প্রতি সম্মান প্রদর্শন- এসবই একটি পরিণত গণতন্ত্রের পরিচয়। ক্ষমতায় আসার পর দায়িত্বশীল আচরণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে ইতিবাচক দিকে নিয়ে যেতে পারে।
বাংলাদেশের মানুষ বারবার প্রমাণ করেছে- তারা গণতন্ত্রে বিশ্বাসী, তারা ভোটের শক্তিতে আস্থা রাখে। ভোটের ঝড়ে যে নতুন ভোরের সূচনা হয়েছে, তা টেকসই উন্নয়ন, ন্যায়বিচার ও সামাজিক স্থিতিশীলতার পথে এগিয়ে যাক- এটাই সবার প্রত্যাশা।
‘ভোটের ঝড়ে নতুন ভোর’- এই কথাটি শুধু একটি নির্বাচনী জয়ের প্রতীক নয়, বরং গণতন্ত্রের শক্তি ও জনগণের আস্থার পুনর্জাগরণের প্রতিচ্ছবি। ভোটের ঝড় প্রমাণ করে জনগণই সর্বশক্তির উৎস।ঐতিহাসিক বিজয় কেবল একটি সূচনা। সামনে রয়েছে দীর্ঘ পথ, কঠিন সিদ্ধান্ত এবং বড় দায়িত্ব। যদি নতুন সরকার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সুশাসন ও উন্নয়নের পথে অগ্রসর হতে পারে, তবে এই নির্বাচন ভবিষ্যতে ইতিহাসের পাতায় স্থান পাবে একটি মোড়-ফেরানো মুহুর্ত হিসেবে।ভোটের ঝড়ে নতুন ভোর হলো আশা, আস্থা ও অগ্রগতির প্রতীক- যেখানে জনগণের শক্তিই রাষ্ট্র পরিচালনার মূল চালিকাশক্তি। ভোটের ঝড়ে যে আলো জ্বলে উঠেছে তা যেন নিভে না গিয়ে গণতন্ত্রের আকাশে স্থায়ী প্রভা হয়ে ছড়িয়ে পড়ে- সেটাই জনপ্রত্যাশা।