নজমুল হক, স্টাফ রিপোর্টার গাজীপুর
বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে যেমন উত্তাপ বাড়ছে, তেমনি সাধারণ মানুষের দৃষ্টি নিবদ্ধ হয়েছে নির্বাচন ব্যবস্থাপনার ওপর- বিশেষ করে নির্বাচন কেন্দ্রগুলোর সার্বিক প্রস্তুতি ও পরিচালনার দিকে। একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করতে নির্বাচন কেন্দ্র ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কারণ ভোটার ও রাষ্ট্রের প্রথম প্রত্যক্ষ সংযোগস্থলই হলো নির্বাচন কেন্দ্র। এটা হলো গণতন্ত্রের বাস্তব চিত্র। নির্বাচন কেন্দ্র শুধু ভোট গ্রহণের স্থান নয়; এটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক অঙ্গীকারের প্রতীক। ভোটার যখন নির্বিঘ্নে কেন্দ্রে প্রবেশ করতে পারেন, নির্ভয়ে ভোট প্রদান করেন এবং সম্মানজনক পরিবেশে কেন্দ্র ত্যাগ করেন-তখনই নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পায়। ফলে কেন্দ্র ব্যবস্থাপনায় সামান্য দুর্বলতাও সামগ্রিক নির্বাচন প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। ভোট কেন্দ্রে যে সমস্ত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয় তা উপস্থাপন করছি।
ভোট জট: নির্বাচন কেন্দ্রে ভোট জট বা Vote Jamming একটি গুরুতর সমস্যা যা ভোটারদের অধিকার ক্ষুন্ন করে এবং নির্বাচন প্রক্রিয়ায় বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ করে। নির্বাচন কেন্দ্রে অনাকাঙ্খিত ভিড় সৃষ্টি, দীর্ঘ লাইনে দাঁড় করিয়ে রাখা কিংবা নির্দিষ্ট ভোটারদের প্রবেশে ইচ্ছাকৃত বিলম্ব- এসবই ভোট জটের সাধারণ রূপ। এতে বিশেষ করে নারী, বয়স্ক ও শারীরিকভাবে দুর্বল ভোটাররা নিরুৎসাহিত হন। প্রশাসনিক অদক্ষতা, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা ও বিশৃঙ্খল পরিবেশের কারণে ভোট জট সৃষ্টি হয়। প্রতিটি কেন্দ্রে ভোটারের সংখ্যার অনুপাতে পর্যাপ্ত বুথ স্থাপন ও দায়িত্ব পালনকারীদেরকে স্পষ্ট দায়িত্ব বন্টন নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়াও ভোটার প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ, প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি জোরদার, আইনশৃঙ্খলা ও তদারকি এবং নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে ভোট জট প্রতিকার করা যায়। ভোট জট কেবল একটি ব্যবস্থাপনাগত সমস্যা নয়; এটি গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির ওপর সরাসরি আঘাত। নির্বাচন কেন্দ্রে ভোট জটের কারণগুলো চিহ্নিত করে সমন্বিত ও কার্যকর প্রতিকার বাস্তবায়ন করতে হবে।
ভোট জালিয়াতি: ভোটাধিকার হলো নাগরিকের মৌলিক গণতান্ত্রিক অধিকার। কিন্তু নির্বাচন কেন্দ্রে ভোট জালিয়াতি এই অধিকারকে অর্থহীন করে তোলে এবং নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থা দুর্বল করে। একই ব্যক্তি একাধিকবার ভোট দেওয়া, মৃত বা অনুপস্থিত ভোটারের নামে ভোট দেওয়া এবং জাল পরিচয়ে ভোট দেওয়া ভোট জালিয়াতির অন্যতম পরিচিত রূপ। ভোটারদের কেন্দ্রে যেতে বাঁধা দেওয়া, নির্দিষ্ট প্রার্থীর পক্ষে জোরপূর্বক ভোট দেওয়ানো অথবা কেন্দ্র দখল করে ভোট প্রদানের পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ করা গুরুতর জালিয়াতি হিসেবে বিবেচিত। কিছু ক্ষেত্রে প্রিসাইডিং বা পোলিং কর্মকর্তার অবহেলা, পক্ষপাত বা রাজনৈতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার ভোট জালিয়াতিকে সহজ করে তোলে। এছাড়া ভোট গণনার সময় ইচ্ছাকৃত ভুল, ফলাফল শীট পরিবর্তন বা ফলাফল প্রেরণে কারসাজিও ভোট জালিয়াতির অংশ। শক্তিশালী নির্বাচন ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছ ও নির্ভরযোগ্য প্রযুক্তি ব্যবহার, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নিরপেক্ষ ভূমিকা, পর্যবেক্ষণ ও নজরদারি জোরদার, কঠোর আইন ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে ভোট জালিয়াতি বন্ধ করা সম্ভব। ভোট জালিয়াতি গণতন্ত্রের জন্য এক ধরনের নীরব হত্যাকান্ড। নির্বাচনকে অর্থবহ ও গ্রহণযোগ্য করতে হলে নির্বাচন কেন্দ্রে ভোট জালিয়াতির সব সম্ভাব্য পথ বন্ধ করতে হবে। এজেন্টদের ভূমিকা: নির্বাচন কেন্দ্রে এজেন্টরা মূলত প্রার্থীর প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন এবং ভোট গ্রহণ ও গণনা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে পাহারাদারের ভূমিকা পালন করেন। তাদের সচেতন, সাহসী ও দায়িত্বশীল উপস্থিতি নির্বাচনকে করে তোলে আরও স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য। শক্তিশালী এজেন্ট ব্যবস্থা ছাড়া সুষ্ঠু নির্বাচন কল্পনা করা কঠিন- এ সত্য উপলব্ধি করেই রাজনৈতিক দল ও নির্বাচন কমিশনের উচিত এজেন্টদের ভূমিকা আরও কার্যকর ও নিরাপদ করা। তবে এজেন্টেদের মনে রাখতে হবে- তারা নির্বাচন পরিচালনার কর্তৃপক্ষ নন। ভোটারকে প্রভাবিত করা, বিশৃঙ্খল পরিবেশ সৃষ্টি করা বা কর্মকর্তার কাজে বাঁধা দেওয়া তাদের এখতিয়ারের বাইরে। আইন ও নির্বাচন বিধিমালার মধ্যে থেকেই দায়িত্ব পালন করতে হয়।
কেন্দ্র ব্যবস্থাপনা: পূর্ববর্তী নির্বাচনগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে নির্বাচন কমিশনকে নির্বাচন কেন্দ্র ব্যবস্থাপনায় বেশ কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে-ভোট গ্রহণ কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ জোরদার করা, কেন্দ্রভিত্তিক নিরাপত্তা পরিকল্পনা প্রণয়ন, ব্যালট পেপার ও নির্বাচনী সরঞ্জাম সময়মতো সরবরাহ এবং নারী, প্রবীণ ও প্রতিবন্ধী ভোটারদের জন্য সহায়ক ব্যবস্থা গ্রহণ। বিশেষ করে নারী ভোটারদের অংশগ্রহণ বাড়াতে আলাদা বুথ, স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ এবং সুশৃঙ্খল লাইনের ব্যবস্থা নেয়া জরুরি। অনেক কেন্দ্রে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, যাতায়াতের অসুবিধা, এবং ভোটারদের বসার সুবিধায় ঘাটতি পরিলক্ষিত হয়। কোথাও কোথাও কেন্দ্রের আশেপাশে অপ্রয়োজনীয় ভীড়, প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে- যা নির্বাচন ব্যবস্থাপনার জন্য বড় ঝুঁকি। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কেন্দ্র পরিচালনায় দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের নিরপেক্ষতা ও দৃঢ়তা। চাপের মুখেও আইন ও বিধি মেনে কেন্দ্র পরিচালনা করতে না পারলে পুরো প্রক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্থ হয়।
প্রযুক্তি ও তদারকির গুরুত্ব: ত্রয়োদশ নির্বাচনে প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার নির্বাচন কেন্দ্র ব্যবস্থাপনাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। সিসিটিভি নজরদারি, দ্রুত অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা এবং কেন্দ্রভিত্তিক মনিটরিং টিম থাকলে অনিয়মের সুযোগ কমে আসে। পাশাপাশি নির্বাচন পর্যবেক্ষক ও গণমাধ্যমের অবাধ উপস্থিতি স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সহায়ক ভূমিকা রাখে।
প্রত্যাশা ও করণীয়: এই নির্বাচনে জনগণের প্রধান প্রত্যাশা- ভোটকেন্দ্রে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ, প্রশাসনের দৃশ্যমান নিরপেক্ষতা এবং ভোটারদের পূর্ণ নিরাপত্তা। নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত প্রচেষ্টাই পারে নির্বাচন কেন্দ্রগুলোকে আস্থার কেন্দ্রে পরিণত করতে।ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেবল ক্ষমতার পালাবদলের বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। সেই পরীক্ষায় সফল হতে হলে নির্বাচন কেন্দ্র ব্যবস্থাপনাকে হতে হবে দক্ষ, মানবিক ও প্রশ্নাতীতভাবে নিরপেক্ষ। সুষ্ঠু ভোটগ্রহণ নিশ্চিত হলেই জনগণের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে এবং গণতন্ত্র পাবে তার প্রকৃত অর্থ ও কাঙ্খিত ভিত্তি।