নজমুল হক, স্টাফ রিপোর্টার গাজীপুর
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ক্ষমতার পালাবদল কখনোই কেবল একটি দলীয় সাফল্য নয়; এটি জনগণের আশা—আকাঙ্খার প্রতিফলন। জনগণের প্রত্যক্ষ সমর্থনে গঠিত বিএনপি সরকারের প্রতি আজ দেশের মানুষের প্রত্যাশা বহুমাত্রিক ও গভীর। দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক চাপ, মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব ও প্রশাসনিক অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে জনগণ চায় দৃশ্যমান পরিবর্তন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা। জনপ্রত্যাশার কয়েকটি দিক নিচে তুলে ধরা হলো-
১. অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা
বর্তমানে মূল্যস্ফীতি, রিজার্ভ সংকট ও বেকারত্ব জনগণের নিত্যসঙ্গী। বর্তমান সরকারের প্রথম করণীয় হবে— মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও বাজার ব্যবস্থাপনা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও রপ্তানি খাত শক্তিশালী করা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করা, ব্যাংকিং খাত সংস্কার করা, কর্মসংস্থান ও মানবসম্পদ উন্নয়ন করা এবং আর্থিক শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছ বাজেট প্রদান। জনগণ চায়, বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যোর দাম নাগালের মধ্যে থাকুক এবং তরুণদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের দুয়ার খুলুক।
২. সুশাসন ও প্রশাসনিক সংস্কার
জনগণের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা থাকে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও প্রশাসনিক সংস্কার। বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের সামেন প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে দূর্নীতি কমানো, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা ফিরিয়ে আনা ও নাগরিক সেবা সহজ করা। বিশেষ করে ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণের মাধ্যমে দালালচক্র নিমূর্ল করা। এগুলো বাস্তবায়নে প্রশাসনকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্তকরণ, দূর্নীতিবিরোধী কঠোর অবস্থান, ডিজিটাল গভর্ন্যান্স ও সেবা সহজীকরণ, স্থানীয় সরকার শক্তিশালীকরণ, বিচার ও আইনশৃঙ্গলা সংস্কার, কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন করা অত্যাবশ্যক। সুশাসন ও প্রশাসনিক সংস্কার যদি কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে তা অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও সামাজিক স্থিতিশীলতায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। অন্যথায় সংস্কারের প্রতিশ্রুতি কেবল ঘোষণায় সীমাবদ্ধ থাকবে।
৩. আইনশৃঙ্খলা ও মানবাধিকার
নতুন সরকার গঠনের পর জনগণের প্রথম প্রত্যাশা থাকে নিরাপদ সমাজ ও মানবাধিকার সুরক্ষা। বিএনপি নেতৃত্বধীন নতুন সরকারের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং মানবাধিকার রক্ষা হবে তাদের নীতিগত ও রাজনৈতিক অঙ্গীকারের বড় পরীক্ষা। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়নে পুলিশ ও আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার সংস্কার এবং অপরাধ দমন ও বিচারপ্রক্রিয়া ত্বরান্বিতকরণ; মানবাধিকার সুরক্ষায় আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা; বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং কারাগার ও আটক ব্যবস্থার সংস্কার করা প্রয়োজন। নতুন সরকারের সামনে আইনশৃঙ্খলা ও মানবাধিকার রক্ষা একটি ভারসাম্যের বিষয়—নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে যেন স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ না হয়, আবার স্বাধীনতার নামে বিশৃঙ্খলাও যেন না বাড়ে। কার্যকর সংস্কার, নিরপেক্ষ প্রশাসন এবং আইনের সমান প্রয়োগের মাধ্যমে সরকার জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারে।
৪. নির্বাচন ব্যবস্থা ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালীকরণ ,দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচন ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। নতুন সরকারের নিকট জনপ্রত্যাশা থাকবে— নির্বাচন ব্যবস্থায় আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর ও স্বাধীন করা। এজন্য নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধি করা, সংসদকে কার্যকর বিতর্ক ও নীতি নির্ধারণের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ, রাজনৈতিক সহনশীলতা ও সংলাপ সংস্কৃতি চালু করা এবং গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের স্বাধীনতা রক্ষা করা নতুন সরকারের পবিত্র দায়িত্ব। নতুন সরকারের জন্য নির্বাচন ব্যবস্থা ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালীকরণ হবে ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ভিত্তি। ভবিষ্যতের নির্বাচনগুলো যদি অবাধ, সুষ্ঠু অংশগ্রহণমূলক ও স্বচ্ছ হয় এবং সংসদ যদি কার্যকর ভূমিকা পালন করে, তবে গণতন্ত্র কেবল কাগজে নয়, বাস্তবেও প্রতিষ্ঠিত হবে। ৫. শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাত পুনর্গঠন
নতুন সরকারের নিকট সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জন্যপ্রত্যাশা থাকে মানসম্মত শিক্ষা ও সুলভ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা। শিক্ষাখাত পুনর্গঠনে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন, উচ্চশিক্ষা সংস্কার এবং কারিগরী ও কর্মমুখী শিক্ষা চালু করা। স্বাস্থ্যখাত পুনর্গঠনে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালীকরণ, সরকারি হাসপাতালে সেবার মান উন্নয়ন, স্বাস্থ্যবীমা ও ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং জনস্বাস্থ্য ও মহামারি প্রস্তুতির জন্য রোগ নজরদারি জোরদার, টিকা কর্মসূচি সম্প্রসারণ ও স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি আবশ্যক। বিএনপির নতুন সরকারের জন্য শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাত পুনর্গঠন হবে দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ। শিক্ষায় দক্ষ মানবসম্পদ এবং স্বাস্থ্যখাতে নিরাপদ নাগরিক নিশ্চিত করা গেলে অর্থনীতি, সামাজিক স্থিতিশীলতা ও জাতীয় উন্নয়ন—সবক্ষেত্রেই ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। মানবসম্পদ উন্নয়ন ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়— এ উপলব্ধিই হতে পারে নতুন সরকারের অগ্রাধিকার।
৬. পররাষ্ট্রনীতিতে ভারসাম্য ও বাস্তববাদ
নতুন সরকারের কূটনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রবিন্দু হতে পারে একদিকে আঞ্চলিক ও শক্তিশালী দেশগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা, অন্যদিকে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া। বাস্তববাদী, বহুমাত্রিক ও অর্থনৈতিকভাবে ফলপ্রসূ কূটনীতি গ্রহণ করতে পারলে বাংলাদেশ বৈশ্বিক অঙ্গনে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারবে। জনগণ চায়, পররাষ্ট্রনীতি হোক জাতীয় স্বার্থকেন্দ্রিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নমুখী।
রাজনৈতিক ভাষণে পরিবর্তনের প্রতিশ্রতি দেওয়া সহজ; কিন্তু বাস্তবায়নই আসল পরীক্ষা। জনগণ এখন আর কেবল প্রতিশ্রুতি শুনতে চায় না- তারা দেখতে চায় কার্যকর পদক্ষেপ, দ্রুত ফলাফল ও ন্যায়সঙ্গত শাসন। বিএনপি সরকারের জন্য এটি হবে সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ। একদিকে জনআস্থা পুনর্গঠন, অন্যদিকে রাষ্ট্র পরিচালনায় দক্ষতার প্রমাণ। প্রথম ১০০ দিনের কার্যক্রমই নির্ধারণ করে দিতে পারে, জনগণের প্রত্যাশা পূরণ হবে নাকি হতাশা জন্ম নেবে। ক্ষমতা পরিবর্তন কেবল সরকার পরিবর্তন নয়; এটি নীতির পরির্তন, শাসনের ধরন বদল ও জনকল্যাণের অঙ্গীকার। বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার যদি জনগণের প্রত্যাশা পূরণে আন্তরিক ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে, তবে সেই পরিবর্তনই হবে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য এক নতুন অধ্যায়।