নজমুল হক, স্টাফ রিপোর্টার গাজীপুর
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরেই নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। জ্ঞানচর্চা, গবেষণা ও মানবসম্পদ উন্নয়নের কেন্দ্র হওয়ার কথা যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর, সেখানে নিয়োগ, পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ বারবার সামনে আসছে। এ পরিস্থিতি শুধু শিক্ষার মানকেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে না, বরং মেধাবী শিক্ষক-গবেষকদের মনোবলও দুর্বল করে দিচ্ছে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ে ন্যায়ের শাসন প্রতিষ্ঠা এখন সময়ের সবচেয়ে জরুরি দাবি।
বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অভিভাবক প্রতিষ্ঠান হিসেবে শিক্ষা মন্ত্রণালয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর তদারকির দায়িত্বে রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে—তদারকি ও নীতিনির্ধারণের এই কাঠামো থাকা সত্ত্বেও কেন অনিয়ম থামছে না? নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে অস্পষ্ট যোগ্যতা নির্ধারণ, নির্বাচনী বোর্ডে পক্ষপাতিত্ব, স্বজনপ্রীতি কিংবা দলীয় প্রভাবের অভিযোগ জনমনে আস্থাহীনতা তৈরি করছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতি হওয়া উচিত সম্পূর্ণ মেধা, গবেষণা ও একাডেমিক অবদানের ভিত্তিতে। কিন্তু যখন দেখা যায় যোগ্য প্রার্থী উপেক্ষিত হচ্ছেন এবং অপেক্ষাকৃত কম যোগ্য কেউ বিশেষ সম্পর্ক বা প্রভাবের কারণে সুবিধা পাচ্ছেন, তখন সেটি শুধু ব্যক্তি নয়, পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য ক্ষতিকর বার্তা দেয়। দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব পড়ে পাঠদানের মান, গবেষণার গুণগত মান এবং আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়েও।অন্যদিকে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তেও স্বচ্ছতার অভাব দেখা যায়। বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন, বাজেট ব্যবস্থাপনা কিংবা ক্রয় প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনামকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। বিশ্ববিদ্যালয় হলো চিন্তার স্বাধীনতার স্থান; কিন্তু যখন প্রশাসনিক অস্বচ্ছতা ও রাজনৈতিক প্রভাব একাডেমিক পরিবেশকে প্রভাবিত করে, তখন শিক্ষার্থীরাও হতাশ হয়ে পড়ে। এর ফলশ্রুতিতে শিক্ষাঙ্গনে অস্থিরতা তৈরি হয়, যা দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য অশনিসংকেত। এ প্রেক্ষাপটে শিক্ষামন্ত্রীর কার্যকর ও দৃঢ় পদক্ষেপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথমত, শিক্ষকসহ বিভিন্ন নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে একটি অভিন্ন নীতিমালা প্রণয়ন এবং তা বাস্তবায়নে নজরদারি জোরদার করতে হবে। নির্বাচনী বোর্ডে বাইরের স্বতন্ত্র বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্তি এবং সাক্ষাৎকার ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়া রেকর্ডভিত্তিক করা যেতে পারে। প্রার্থীদের একাডেমিক স্কোরিং পদ্ধতি প্রকাশ করলে স্বচ্ছতা বাড়বে।
দ্বিতীয়ত, অভিযোগ গ্রহণ ও তদন্তের জন্য স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সেল গঠন করা প্রয়োজন। যেখানে শিক্ষক, শিক্ষার্থী বা কর্মচারীরা নিরাপদে অনিয়মের তথ্য দিতে পারবেন। অভিযোগের দ্রুত ও নিরপেক্ষ নিষ্পত্তি হলে আস্থার পরিবেশ তৈরি হবে। পাশাপাশি দুর্নীতি বা অনিয়ম প্রমাণিত হলে কঠোর শাস্তির নজির স্থাপন করতে হবে—যাতে ভবিষ্যতে কেউ একই পথে হাঁটার সাহস না পায়।
তৃতীয়ত, ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা জোরদার করা জরুরি। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি থেকে শুরু করে ফলাফল প্রকাশ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া অনলাইনে স্বচ্ছভাবে পরিচালিত হলে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ কমবে। বাজেট ও প্রকল্প ব্যয়ের তথ্যও ওয়েবসাইটে প্রকাশ করলে জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে।
চতুর্থত, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন রক্ষা করেই জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। স্বায়ত্তশাসন মানে অনিয়মের স্বাধীনতা নয়; বরং দায়িত্বশীল ও নৈতিক নেতৃত্বের মাধ্যমে একাডেমিক উৎকর্ষ সাধন। এজন্য উপাচার্য ও উচ্চপদস্থ প্রশাসকদের নিয়োগেও স্বচ্ছতা ও যোগ্যতার ভিত্তি নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
সবশেষে বলা যায়, উচ্চশিক্ষা একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রধান স্তম্ভ। বিশ্ববিদ্যালয়ে যদি ন্যায় বা নীতির শাসন দুর্বল হয়, তবে জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তিও দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই শিক্ষামন্ত্রীর দূরদর্শী নেতৃত্ব, কঠোর নজরদারি এবং জিরো টলারেন্স নীতি প্রয়োগের মাধ্যমেই বিশ্ববিদ্যালয়ে শুদ্ধতা ও আস্থার পরিবেশ ফিরিয়ে আনা সম্ভব। সময় এখন কথার নয়, কার্যকর পদক্ষেপের। উচ্চশিক্ষাকে বাঁচাতে নীতির শাসনই হোক সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।